হোসেনউদ্দীন হোসেন

 


সাহিত্য : ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা ও কল্পনার রূপ

 

গল্পসাহিত্য সৃষ্টি হয় ব্যক্তির ব্যক্তিগত চিন্তাচেতনা এবং কল্পনার উপর নির্ভর করে। নিজের বিশেষত্বের মধ্যে যা ব্যক্ত হয়, তাই ব্যক্তি। সেই ব্যক্তি- যে উপলব্ধিকে ব্যক্ত করে। সাহিত্যের ব্যক্তি কেবল মানুষ নয়- সাহিত্যের ব্যক্তিজগতের সমুদয় বস্তুসামগ্রী। নিজের ঐকান্তিকতায় সে নিজেই ব্যক্তি হয়ে ওঠে। যে গুণের দ্বারা ব্যক্তি হয়ে উঠলে মানুষের অন্তর স্বীকার করে নেয়- এই দুর্লভ গুণের অধিকারী সে, যে কল্পনাশক্তি ও রচনাশক্তির গুণে গুণান্বিত।

একজন  সৃষ্টিশীল ব্যক্তি নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কি প্রকাশ করতে চায়? সে প্রকাশ করতে চায় নিজের উপলব্ধিকে। সে যে আছে, এই সত্যটাকে সে সৃষ্টিশক্তির গুণে চিরকালীন রূপে প্রকাশ করতে চায়। ব্যক্তি যখন কোনো কিছু ব্যক্ত করে তখন তার সেই অভিব্যক্তির মধ্যে একটা ঐশ্বর্য থাকে, এই ঐশ্বর্য হচ্ছে নিজস্বভাবনা। তাঁর অন্তরের ভাবনার অলোড়ন দোল দেয় বলে- সে তার ভাবনাকে একটা রূপের মধ্যে দাঁড় করায়। এই রূপটি রচনা ও কল্পনা শক্তির গুণে সাহিত্য মর্যাদা লাভ করে।

মানুষের সামনে বিশাল জগত দৃশ্যমান। মানুষ আছে, জন্তুজানোয়ার আছে, গাছপালা আছে, পাহাড়পর্বত আছে, নদীনালা সমুদ্র আছে। আবার এমনও বস্তু আছে যা বর্তমান অবস্থার বাইরে মানুষের অন্তরে প্রকাশমান নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে এই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বস্তু মানুষ কীভাবে উপলব্ধি করে? এই প্রশ্নের জবাবে এইটুকু বলা যেতে পারে যে, একদল মানুষ উপলব্ধি করে ভাবের মাধ্যমে, আর একদল মানুষ করে জ্ঞানের মাধ্যমে। জ্ঞানের মাধ্যমে মানুষ জানছে বিষয়কে। যে জানছে সে রয়েছে জানার পশ্চাতে এবং তার জানার বস্তু রয়েছে লক্ষ্য হিসেবে সামনে। এই জ্ঞান বিষয়গত। এই জ্ঞান জাগতে ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন নেই। কারণ এই জ্ঞান সাধনার মাধ্যে ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে রাখা হয়।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ যদি নিজেকে উপলব্ধি করতে চায়, তবে তাকে ভাবের মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে নিজেকে উপলব্ধি করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। নিজেকে উপলব্ধি করার একমাত্র মাধ্যম হলো সাহিত্য। সাহিত্যের মধ্যেই রয়েছে মানুষের সত্যতা ও নিজস্ব উপলব্ধি। এই কারণেই সাহিত্যের জ্ঞান বিষয়গত নয়- এই জ্ঞান ব্যক্তিগত মানুষের উপলব্ধিগত।

ব্যক্তির উপলব্ধি বিচিত্র রকমের কোন যুক্তি ও প্রমাণের মানদণ্ডে বিচার্য নয়। মানুষের সত্যস্বরূপ প্রকাশমান একমাত্র সাহিত্যে গল্প এবং কবিতার বিষয়ের যাথার্থ্যে নয়। সাহিত্যের প্রকাশ চেষ্টার মুখ্য উদ্দেশ্য নিজের প্রযোজনীয় রূপকে প্রতিষ্ঠিত করা নয় আনন্দরূপকে ব্যক্ত করে তোলা। এই আনন্দবোধের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধতা এবং এটাই হলো সাহিত্যরস। এমনকি মানুষের প্রয়োজনকে রূপ দেওয়া সাহিত্যের উদ্দেশ্য হতে পারে না সাহিত্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বড় এবং অনেক স্বতন্ত্র। সৃষ্টিশীল গল্প রচয়িতার কাজ হলো প্রয়োজনকে সুষমামণ্ডিত করা নয় তাকে নিঃশেষিত করা নয়- পূর্ণতার একটি আদর্শকে প্রত্যক্ষতা দান এবং রূপলোকে অপরূপকে ব্যক্ত করে তোলা। এটাই হলো সাহিত্যের মূল জিনিস- অর্থাৎ রূপ সৃষ্টি। রূপসৃষ্টি করতে পারলেই তিনি হবেন দক্ষরূপকার। এই রূপসৃষ্টি করতে গিয়ে তিনি বাস্তব অবস্থাকে কল্পনায় আনতে পারেন, আবার অবাস্তব জিনিসও কল্পনার মাধ্যমে তুলে ধরতে পারেন। এটা নির্ভর করে গল্পলেখকের কল্পনাশক্তির ও রচনাশক্তির উপর। যদি তিনি সমগ্রতাদান করতে পারেন, তাহলে তিনি হবেন সার্থক- তা না হলে নয়।

মাঝে মাঝে সমাজে এমন উত্তেজনা দেখা দেয় যে, সেই উত্তেজনাটা সাহিত্যের আঙিনা দখল করে বসে। সেই সামায়িক উত্তেজনাকর বিষয়টি সাহিত্যের নিত্যবিষয় হয়ে কখনো টিকে থাকেনা- দেখতে দেখতে বিলীন হয়ে যায়। এই জন্যে গল্পলেখকরা যা কিছু করে এবং যা কিছু শিল্পরূপ দেয়, তার জানার মধ্যে এবং কাজের মধ্যে থাকে কোনো না কোনো ঐক্যসূত্র। গল্পলেখকের জানার মধ্যে একান্তভাবে পার্থক্য কিছু নেই। যেখানে দেখার মধ্যে অথবা জানার মধ্যে অস্পষ্টতা, সেখানেও সে জানে, মিলিয়ে জানতে পারেনা বলেই তার কাছে থেকে যায় অস্পষ্টতা। লেখক যখন অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে, তখন তার অন্তরেই ভাবের প্রবল ঢেউ উঠে, সেই উপলব্ধির ঢেউয়ের দ্বারা আনন্দবোধ করে সে এবং বিষয়কে উপলক্ষ্য করে, উপাদানের উপর নির্ভর করে একটি অখণ্ড রূপকে গল্পের মধ্যে ফুটিয়ে তোলে। এই রূপটি পরিপূর্ণ এককে চরম রূপ দিতে যতক্ষণ সে না পারে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্তরলোকের সঙ্গে বর্হিলোকের মিলন ঘটাতে পারে না। যার অন্তরে রসবোধ নেই, তার পক্ষে চরম এককে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। সে দেখে শুধু উপাদানের এবং প্রয়োজনের দিকটি। ফলে সাহিত্যের মূল্য নিরূপণ করা তার পক্ষে কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।

গল্পসাহিত্যের একটা বিশাল ভূমিকা আছে। গল্পে কোন বস্তু সত্য, তা নির্ধারিত হয় গল্পে রসের ভূমিকার উপরেই। তাই গল্পমাত্রই রসসাহিত্য। এই রস রূপটি প্রকৃতির কাছ থেকেই মানুষ পেয়েছে, না মানুষই প্রকৃতিকে দিয়েছে, এটাও একটি প্রশ্ন। গাছপালা নদী কালে কালে মানবমনের সংস্পর্শে বিশেষ রসের রূপায়িত হয়ে উঠেছে মানুষের কল্পনার কারণে। মানবজগতে শুধু প্রাকৃতিক নয়- তা মানবিকও বটে। প্রকৃতি তাকে বিশেষভাবে আনন্দ দেয় যেমন তেমনি মানুষ সমগ্র জগতকে হৃদয়রসের সংযোগে মানবিকতায় আবৃত করেছে, এবং তাকে ভোগও করছে। গল্পলেখকের মন রসের অনুভূতিতে যখন ছাপিয়ে যায়, তখনই সে গল্প লিখে প্রকাশ করে নিত্যকালের ভাষায়, ভাষাকে সে মানুষের অনুভূতির ভাষা করে তোলে। এটা জ্ঞানের ভাষা নয়, হৃদয়ের ভাষা, কল্পনার ভাষা। লেখক যখনই কোন বস্তু বা ঘটনা ভাবের চোখে দেখে- তখনই তার দেখা জাগতিক থাকে না, হয়ে ওঠে অজাগতিক। সে বস্তু তখন আর ক্যামেরায় তোলা ছবির মত থাকে না। দেখার মধ্যে একটা ভিন্নমাত্রা এসে যায় । সেই দৃশ্যটাকে হুবহু বর্ণনা করাও যায় না। বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের সত্যতার কোন সম্পর্ক নেই। তার সত্যতা তার নিজের উপলব্ধির মধ্যে। সেটা উদ্ভূত হতে পারে, অলৌকিকও হতে পারে। তথ্যহীনও হতে পারে। যার উপলব্ধির গভীরতা বেশি তাঁর সাহিত্যকর্মে জীবন আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে।

এ মানুষের মনে আদিকাল থেকে রয়েছে একটা ক্ষুধা। এই ক্ষুধা নিবারণ করেছে তার মনের কল্পনার জগতের নানা কল্পনা। সে কল্পনা করে নানা রকমের উদ্ভট গল্প তৈরি করেছে- তৈরি করেছে রূপকথার কাহিনি। নিজে যেমন গল্প বানিয়েছে, তেমনি সেই গল্পটি অপরকেও শুনিয়েছে। এই গল্প বলে ও গল্প শুনিয়ে চরম একটা তৃপ্তি পেয়েছে ব্যক্তিমানুষ। তার মন যখন যা চেয়েছে, কল্পনার মধ্যে সেটা পেয়ে তার মন খুশি হয়ে উঠেছে। আকাশের সঙ্গে সে আকাশ হয়েছে, সমুদ্রের সঙ্গে সে সমুদ্র হয়েছে, পাহাড়ের সঙ্গে পাহাড় হয়েছে, চাঁদের সঙ্গে চাঁদ হয়েছে নক্ষত্রের সঙ্গে নক্ষত্র হয়েছে, মন চেয়েছে যার সঙ্গে মিলতে, তার সঙ্গে মনের মিলন হলেই মন হয়েছে খুশি। এইভাবে কল্পনার জগৎ থেকেই নানারকম গল্পের কাহিনি বের করে এনেছে ব্যক্তিমানুষ। মনের ভুবন জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে তার নানারঙের লীলা। এই লীলার মধ্যেই পেয়েছে সে রূপ-রসের সৌন্দর্য। সাহিত্যের সৌন্দর্য প্রচলিত সৌন্দর্যের সঙ্গে মেলে না। সাহিত্যের সৌন্দর্য ভিন্ন। মন যার সঙ্গে মিলে যায়, মন যার সঙ্গে মিলে আনন্দ পায়, সেটাই হলো সাহিত্যের সোন্দর্য। এই সৌন্দর্য হলো সাহিত্যের একমাত্র সামগ্রী। অনেকেরই ধারণা যে, সৌন্দর্য হচ্ছে সাহিত্যের প্রাণ। এই ধারণার মধ্যে সত্যতা নেই। সাহিত্যের কিংবা শিল্পের অভিজ্ঞতা কখনো মেলানো যায় না। মূলত আনন্দবোধই হচ্ছে সাহিত্য ও শিল্পের সৌন্দর্য। এই আনন্দবোধ সাহিত্যের সৌন্দর্যবোধকে নিবিড়ভাবে জাগিয়ে তোলে। কেউ যদি এই সৌন্দর্যকে স্বীকার করে না নেয়, তাতে কোনো ক্ষতি নেই। জগতের অনেক অবাঞ্ছিতের মধ্যে মন যাকে স্বীকার করে নিচ্ছে- তাতেই রয়েছে সৌন্দর্য। সাহিত্যের মধ্যেই এই সৌন্দর্যের উপলব্ধি। সাহিত্যের বাইরে নয়। সাহিত্যের এই সৌন্দর্য আাছে বলে মানুষের গল্প শোনার প্রতি রয়েছে বিপুল আগ্রহ। কারণ, মন গল্পের সৌন্দর্যকে টানে। গল্পে দুঃখের কাহিনিও আছে। সুখের কাহিনিও আছে। গল্প মানবমনকে শুধু প্লাবিত করে তোলে না- মানবমনকেও স্পষ্ট করে তোলে। নিজের কাছে নিজেকে নতুন করে ভাবায়। ভিন্নতর এক মানবে তাকে পরিণত করে। এটা নিজের কাছে নিজের অপরূপকে চাওয়া- এই চাওয়াটা নিজেকে সঁপে দেয়া নয়- নিজেকে পরম করে পাওয়া। নিজের চাওয়ার মধ্যে যে ভাবকল্পনা রয়েছে, এই ভাবকল্পনার মধ্যে রয়েছে মানবমনের অবিমিশ্র উপলব্ধি। মানবমন যে বস্তুকে প্রিয় বলে ভাবে, সেই বস্তুকে সে সত্যভাবে পেতে চায়। এই সত্যবোধই তার কাছে পরম সুন্দর।

সৃষ্টিশীল ব্যক্তিমন সাধারণত উপলব্ধির ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করে থাকে। তার হৃদয় জগতে মানুষের জীবন-যাপনের বহুতর দ্বন্দ্বের উপলব্ধি। বিচিত্র রকমের ভাবনা আর কল্পনা নিয়েই তার কারবার। ভাবনা  এবং কল্পনা আছে বলেই সে নতুন নতুন সৃষ্টির কথা ভাবে। নিজের ভেতর সে নিজেকে সৃষ্টি করছে অহরহ। এবং নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে নানাভাবে এবং নানারূপে। সে নিজের উপলব্ধি থেকে নিজেকে আস্বাদন করতে চায়। এই আস্বাদন থেকে সৃষ্টি করে সে গল্প। কিন্তু এর মধ্যেও রয়েছে মূল্যের তারতম্য। তার কারণ হলো এই যে, তার সব গল্পের মূল্য এক নয়। রস ও রূপের  নির্বাচনে এবং আনন্দসম্ভোগের বিচারে নির্ভর করছে তার মূল্যের বিষয়টি। শুধু মনস্তত্বের কৌতুহল চরিতার্থ করার জন্যই গল্প নয়, কিংবা বুদ্ধির প্রাখর্য প্রকাশ করার জন্যই গল্প নয়, গল্পের বাছবিচার আনন্দভোগের উপরেই। সাহিত্যের আনন্দভোগের জন্য প্রয়োজন মনের সুস্থতা। কারণ মানুষের মনে নানারকম অরুচি রয়েছে। নানা রকম বিকৃতি রয়েছে। যখন মানুষের মনে অসুস্থতা এসে ভর করে, তখন সে ভালো জিনিসের স্বাদ বোঝে না। খারাপটিই তার কাছে স্বাদে অতুলনীয় বলে হয়। যখন মানুষের মন সুস্থ থাকে, তখন মানুষ ফিরে পায় তার নিজস্ব মানবিক স্বভাব; এটাই তার চিরকালের স্বভাব। চিরকালের স্বভাব ফিরে পেলে মানুষ লাভ করে আনন্দ সম্ভোগের আস্বাদ। সাহিত্যও তখন নানারকম ভঙ্গি ত্যাগ করে চিরন্তন সাহিত্য হয়ে ওঠে। মানুষের জগৎ মানুষের চিত্তের মধ্যে রয়েছে। বাইরে নয়। মন যখন জগতকে নিজের করে নেয়, তখনই তার ভাষায় জীবন্ত হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :

মানবঘটনাকে সুস্পষ্ট করে দেখবার আর একটি ব্যাঘাত আছে। সংসার অধিকাংশ স্থলে ঘটনাগুলি সুসংলগ্ন হয় না, তার সমগ্রতা দেখতে পাইনে। আমাদের কল্পনার দৃষ্টি ঐক্যকে সন্ধান করে এবং ঐক্য স্থাপন করে। পাড়ায় কোন দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য হয়ত জেনেছি বা খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু এই ঘটনা তার পূর্ববর্তী পরবর্তী দূর শাখাপ্রশাখাবর্তী একটা প্রকাণ্ড ট্রাজেডিকে অধিকার করে হয়তো রয়েছে- আমাদের সামনে এই ভূমিকাটি নেই- এই ঘটনাটি হয়তো সমস্ত বংশের মধ্যে পিতা-মাতার চরিত্রের ভিতর দিয়ে অতীতের মধ্যেও প্রসারিত, কিন্তু আমাদের কাছে অগোচর। আমরা তাকে দেখি টুকরো টুকরো করে, মাঝখানে বহু অবান্তর বিষয় ও ব্যাপারের দ্বারা সে পরিচ্ছন্ন, সমস্ত ঘটনাটির সম্পূর্ণতার পক্ষে তাদের কোনগুলি সার্থক কোনগুলি নিরর্থক তা আমরা বাছাই করে নিতে পারিনে। এই জন্য তার বৃহৎ তাৎপর্য ধরা পড়ে না। যাকে বলছি বৃহৎ তাৎপর্য তাকে যখন সমগ্রভাবে দেখি তখনই সাহিত্যের দেখা হয়।

আসলে আমরা কোনোকিছুই সমগ্রভাবে দেখি না বলেই আমাদের গল্পও ঠিকমত সাহিত্য হয়ে ওঠে না। আমাদের এই জীবনে কতো কিছুই তো দেখেছি। দেখেছি দেশ বিভাগ, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, দেখেছি আইয়ুবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, দেখেছি বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাস, বন্যা-দুর্ভিক্ষ, দেখেছি কৃষকদের খরায় ও অতিবৃষ্টিতে ফসলহানি, শ্রমজীবী মানুষের মানবেতর জীবন-যাপন, গ্রাম ছেড়ে ভূমিহারা দূর্গত মানুষদের শহরের দিকে গমন, দেখেছি মানুষের রাতারাতি ধনী হওয়ার ন্যাক্কারজনক ঘটনা, দেখেছি ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতাদের ভণ্ডামী ও মিথ্যা প্রবঞ্চনা। দেখেছি একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ। কোনটিতেই আমরা সমগ্রভাবে উপলব্ধি করিনি। রাস্ট্রীয় জীবনে হোক, সামাজিক জীবনে হোক, কিংবা ব্যক্তিগত জীবনে হোক, আমরা প্রতিনিয়তই তো কত ঘটনা প্রত্যক্ষ করছি; এই খণ্ড খণ্ড ঘটনাগুলিকে যদি কেউ বাছাই করে নিয়ে নিজের কল্পনার পটে সাজিয়ে একটি সমগ্রতার ভূমিকায় এনে গল্প সৃষ্টি করত, তবে সেই গল্প হয়ে উঠতো জীবনের গল্প।

প্রতিদিন আমাদের দেশে যে ঘটনা ঘটছে, তা আমরা সংবাদপত্রের পাতায় পড়ছি। এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে রয়েছে দেশকাল ও সময়ের ইতিহাস। রয়েছে বীর্যবত্তার কাহিনি, রয়েছে সফলতার কাহিনি, রয়েছে ব্যর্থতার কাহিনি, রয়েছে মর্মভেদী শোকের কাহিনি। প্রতিদিন সংবাদপত্রের ছায়ালোকে এই ঘটনাগুলি ছায়া হয়ে আছে। আমাদের সাহিত্যের জ্যোতিষ্কলোকে নেই। কল্পনার শক্তি ও রচনা শক্তির অভাবে নিত্যকালের মানবমনের বিরাটমূর্তি কেউ নির্মাণ করে তুলে ধরতে পারেনি।

লেখকের সামনে বিশাল বস্তুজগৎ আছে। সে প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছে মানবসমাজের নানা রকমের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন ছোট-বড় দ্বন্দ্ব-বিরোধ। রয়েছে তার মানসজগৎও। বহুকালের রচনার মতো জমে রয়েছে অভিজ্ঞতার ফসল। যদি কেউ ইচ্ছে করে তবে ঐ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার থেকে মানুষের সম্বন্ধে সে জ্ঞান লাভ করতে পারে। আবার প্রকাশ বৈচিত্র্যবান মানুষ ঐ অভিজ্ঞতাকে গল্পে রূপ দিতে পারে। আমরা নৈকট্য কামনা করতে পারি সেই প্রকাশ বৈচিত্র্যমান মানুষকে। তার কাছে আমাদের একমাত্র চাওয়া- গল্প শোনাও, সেই গল্প, যে গল্পে রয়েছে মানব পরিচয়ের সমগ্র ছবি। রয়েছে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত, রয়েছে রূপের মোহিনী শক্তি। রয়েছে জীবন জয়ের গল্প। রয়েছে প্রেম ভালোবাসা, রয়েছে ঈর্ষা যন্ত্রণা, রয়েছে অন্তরের সঙ্গে অন্তরের মিলন, রয়েছে ভালো-মন্দ, শুভ-অশুভ। রয়েছে সুখের এবং দুঃখের পাঁচালী। গল্পকার কেবল কি গল্প বলে? মূল্যবোধেরও জন্ম দেয়। সে জীবনের বাস্তবতা ও কল্পনা ছেনে গড়ে তোলে জীবনের নতুন মূল্যবোধ। জীবন সম্পর্কে সে যেমন নতুন ধারণা দেয়, তেমনি সে জীবনকেও বদলে দিতে পারে।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। বাস্তব এবং সাহিত্যের বাস্তব এক নয়। সাহিত্যের বাস্তব হলো ভিন্ন। যাকে মানুষ অন্তর থেকে অব্যবহিতভাবে মেনে নেয়, সেটাই হলো সাহিত্যের বাস্তব। এই বাস্তবতা একান্ত উপলব্ধিগত। মন যাকে ‘বোধ’ করছে তাই বাস্তব। অর্থাৎ ইংরেজিতে যাকে বলি আমরা ‘রিয়েল’, বাঙলায় আমরা তাকে বলি ‘যথার্থ’। অর্থাৎ এই ‘যথার্থ’ শব্দের একটা অর্থব্যঞ্জনা আছে। গল্প সাহিত্যের চরম অন্বিষ্ট ‘যথার্থ’। এ সম্পর্কে ভার্জিনিয়া উল্ফ্ মন্তব্য করেছেন :

To service, each sentence must have, at it’s hear , a little spark of fire,and this. Whatever the risk, the move list must pluck with his own hands from the blaze. His state them is a precarious one. He must expose himself to life ; He must risk the danger of being led away and tricked by her deceitfulness: he must seize her treasure from her and let her trust run to waste. But at a certain moment he must leave. The company and withdraw; alone, to that mysterious room where his body is hardened and fashioned into permanence  by processes which,if they elude the critic , hold for him so profound fascination.

এই মন্তব্যের মধ্যে আমরা পাবো ‘যথার্থে’র মর্ম এবং অর্থব্যঞ্জনা। যে এগিয়ে যেতে পারবে- সে এগিয়ে যাবে- যে এগিয়ে যেতে পারবে না সে পিছিয়ে থাকবে, এটাই হলো মূলকথা। আর কিছু নয়।