মন্দিরা ঘোষ

 

গৌরাঙ্গদা : আমার চোখে

 

"ব্যবিলনীয় শূন্যটি যেটি একটি উদ্যানকে শূন্যোদ্যান বানিয়েছে সেটি আমার,

সমস্ত বিশ্ব চর্যাপদের  হরিণীর পায়ে একটি শূন্য হয়রান হয়ে ছুটে মরে"

                                - গৌরাঙ্গ মিত্র।       

 

কারো কারো সান্নিধ্য অনেকটা নদীর পাশ দিয়ে শান্ত হেঁটে যাওয়ার মত,কোন নরম বিকেলের কাছে নত হয়ে থাকা মেঘ,কখনো বা শ্রদ্ধার পার ছুঁয়ে জেগে ওঠে কোন আশাবরী  রাগের সুর....।ভরসার শব্দরা কোথাও আত্মবিশ্বাসী  করে.... আপাত অচেনা স্বর কখনো খুব আপন আর আন্তরিক হয়ে ওঠে। ....এসব কথা কলমে কেন  উঠে এলো অজান্তে তার নিশ্চিত  কোন কারণ অবশ্য  থাকে।হয়ত বাইরে নয়,  মনের  গভীরে শব্দগুলি নিজের মত করে পোশাকি হয়ে ওঠে  কোন সম্পর্কনামের গায়ে।যে মানুষটিকে  নিয়ে কিছু শব্দের খেয়াল ভাবনার চারপাশে জট বাঁধছে,যা খুব স্বল্প পরিসরের চেনার আবহে কিন্তু তাঁর  আন্তরিকতা কখন যে আত্মীয়তার  চাদরে  জড়িয়ে  নিয়েছি , বুঝিনি। যাঁকে নিয়ে এত কথা,তিনি আর কেউ  নন,আমাদের সকলের অত্যন্ত পরিচিত প্রিয়  মানুষ কবি ভ্রমণকার  গৌরাঙ্গ মিত্র।

 

অল্পদিনের পরিচয়ে তাঁর লেখার চেয়ে মানুষটিকে  চিনেছি বেশি।পরে তাঁর লেখা ভ্রমণ কাহিনি,  কবিতায় আরো বেশি  করে চেনা জানার গন্ডি বাড়িয়েছি।তাঁর সাথে পরিচয় হয় কবি প্রভাত চৌধুরীর সাহায্যে,সম্পর্কে কবি  প্রভাত চৌধুরী   আমার মানিকমামা।শুধুমাত্র আত্মীয়তায় নয়, অনেকটা স্নেহের আবদারেও। আমার জড়তা কাটিয়ে এই লেখার  জগতে প্রবেশ করতে অনেকখানি অবদান মানিকমামার।একজন মানুষের সাফল্য,ব্যর্থতা, পারা বা না পারার মাপকাঠি  নির্ধারিত হয় অনেক সময় তার বহির্মুখী  বা অন্তর্মুখী স্বভাবগুণে।সেই জড়তা,সেই অন্তর্মুখী  স্বভাব আমি কাটিয়ে উঠেছিলাম কবিতা পাক্ষিকের  সান্নিধ্যে এসে যদিও তা বেশি দিনের ঘটনা  নয়।গৌরাঙ্গদার লেখা বা ব্যক্তি গৌরাঙ্গদার সাথে আমার আলাপ একবছর আগে সমিধ পত্রিকা প্রকাশ অনুষ্ঠানে।আর গৌরাঙ্গদার কথা বলতে গেলেই রীতাদির নাম এসে পড়ে অবধারিতভাবে। যৌথনামের উচ্চারণে  এমন আন্তরিক  ভাগীদার, দেখলে মনের কোণে ঈর্ষা জমা হয় বই কি!দুজনেরই এত  আপন করা   স্বভাব, কখন  যে আত্মীয়তার  বন্ধনে বাঁধা পড়েছি বুঝতে পারি নি।রীতাদির মতো এমন যোগ্য  সঙ্গী পাওয়া সত্যিই  অবাক করে আজকের দিনে।আসলে গৌরাঙ্গদা এমনই সরল সহৃদয়  একজন মানুষ যাঁর  সান্নিধ্যে থাকলে হয়ত সকলের মনের রং এমন খাঁটি  হয়ে ওঠে। কবিতা পাক্ষিকের নানান অনুষ্ঠানে, সমিধ পত্রিকা  প্রকাশ,কফিহাউসের চারপাশে পত্রিকার উদ্বোধনে,  মহাবোধি সোসাইটি হলে,কবি প্রভাত চৌধুরীর  পঁচাত্তরতম জন্মদিন উৎসব  অনুষ্ঠানে  গৌরাঙ্গদার উপস্থিতি, সান্নিধ্যলাভ আমাকে সমৃদ্ধ করেছে প্রতিনিয়ত । আমার কবিতা মনোযোগ  দিয়ে শোনা,প্রতিটি শব্দের উচ্চারণ  ওনার কাছে পৌঁছনোর আভাস আমাকে অবাক ও বিস্মিত করেছে । ওনার প্রশংসা,উপদেশ আমাকে যে অনেকখানি সাহস জুগিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরবর্তীকালে যতবার দেখা হয়েছে উনি ও রীতাদি স্নেহে আর আন্তরিকতায় বেঁধেছেন বারে বারে।অবাক  হয়েছি  শুনে যে, ওনার চোখে দেখার অসুবিধাহেতু রীতাদির কাছেই শুনে থাকেন আমার নানা জায়গায় প্রকাশিত কবিতাগুলি। টেলিফোনে দীর্ঘক্ষণ কবিতার আলোচনায় যেমন প্রশংসার কথা বলেন,তেমনি জেনে নিয়েছি নিজের প্রয়োজনীয়  ঘাটতির কথা। উনি বুঝিয়ে দিয়েছেন আন্তরিক ভাবে,উপদেশ শিরোধার্য  করছি,আর নিজেকে বার বার ধন্য মনে করেছি। কারণ আমার  সামান্য লেখা যা কবিতা হয়েছে কিনা নিজেও জানি না তা অত্যন্ত যত্নের সাথে পড়েছেন, মতামত দিয়েছেন,দিশা দেখিয়েছেন,সর্বোপরি  সাহস দিয়েছেন নতুনদের কাছে আলোর  দিশা। তাঁর লেখনী নিয়ে বলার মতো স্পর্ধা  বা ক্ষমতা কোনটাই আমার নেই।তবু মুগ্ধ হই যখন ভ্রমণকাহিনির দেখাগুলি নিজের দেখা হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতা আজকের  উত্তর আধুনিক আকাশে জ্বলজ্বলে তারা হয়ে আমাদের পথ দেখায়।

শেষটানে আবার বলতে ইচ্ছে করে এমন মানুষের সান্নিধ্যে  এলে মন ভালো করা রোদ ঝলমলে আকাশ সামনে এসে দাঁড়ায়,আলোর মতো শব্দরা কবিতায় নামে। ভয়ের শূন্যতা নয় সাহসের পদাবলী জানলায় উড়ে উড়ে আসে আন্তরিক শব্দের  ডানায়।

"প্রতিটি শূন্যের হাতে আছে নিজস্ব বর্ণালী"... তাঁর স্মৃতিচারণে  তাঁর  না থাকার বর্ণনায় তাঁরই ভালোবাসার নিজস্ব বর্ণালীতে আমরা আলোকিত হবো, সেই আলোকময় পথের দিশারী হয়ে গৌরাঙ্গদা চিরকাল রইবেন আমাদের অন্তরমহলে।