শ্রীশুভ্র

 

শ্রীশুভ্রের প্রবন্ধ

ইসলাম উর্দু পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে এটাই ছিল অনেক বাঙালি মুসলিমের অন্তরের ভাষ্য। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে মিলে সেই সব বাঙালি মুসলিম সেদিন তৎকালীন পূর্ব বঙ্গে এই ইসলাম উর্দু পাকিস্তানের স্বপ্নকেই বাস্তবায়িত করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন। পরবর্তী ইতিহাস আমরা সকলেই কম বেশি জানি। ইতিহাসের পাতায় সেইসব বাঙালি মুসলিমের পরিচয় কিন্তু দেশদ্রোহী রাজাকার হিসাবেই। বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাজাকারদের অবস্থান ইত্যাদি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়। আমরা ইতিহাসের আলোতে দেখে নিতে চাইছি এই ইসলাম উর্দু পাকিস্তানের বিষয়ইকেই।

বাঙালির যে একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা রয়েছে। বাঙালির যে হিন্দু মুসলিম সম্প্রদায় নিরপেক্ষ একটি অভিন্ন বাঙালিয়ানার সংস্কৃতি রয়েছে। বাঙালির যে একটি স্বতন্ত্র শিল্প সাহিত্য সঙ্গীত নৃত্য চারুকলা ভাষ্কর্য ইত্যাদির ঐতিহ্য রয়েছে। এবং বাঙালি যে একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ুতে গড়ে উঠেছে। তার ভাষা সংস্কৃতি সমাজ অর্থনীতি ইত্যাদি সব দিক দিয়েই সে যে স্বতন্ত্র একটি জাতি। সেই কথাটি ১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিম সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট যেদিন বাংলা ভাগ হলো। সেই দিনটি যে আপামর বাঙালির জীবন ও ইতিহাসে কলঙ্কতম দিন। না, এই সত্য বিগত এতগুলি দশকেও বাঙালি জাতি হিসাবে সম্প্রদায় হিসাবে কি শিক্ষিত কি অশিক্ষিত, কেউই অনুধাবন করেনি। বা আরও সঠিক ভাবে বললে, করতে চায় নি। একটি জাতির পক্ষে এতবড়ো কলঙ্কজনক দিন আর হয় না। যেদিন তার দেশ দুটুকরো হয়ে যায়। দুটুকরো হয়ে গিয়ে, ভিন্ন ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর অন্য দেশের সাথে জুড়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ঠিক সেটিই হয়েছিল। বাঙালির সোনার বাংলা দুটুকরো হয়ে এক টুকরো ভিন্ন ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর দেশ হিন্দুস্তানের অধীনে চলে গিয়েছিল। যা আজও সত্য। অন্য টুকরোটি ঠিক সেরকমই ভিন্ন ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর দেশ পাকিস্তানের অধীনে চলে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের কথা, সেদিন একটি দেশের আপামর জনগণ তার স্বাধীন সার্বমৌত্ব অবলুপ্তির ঘটনায় শোকগ্রস্ত হয় নি। উল্টে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আলাদা আলাদা দিনে, ভিন্ন ভিন্ন দেশের স্বাধীনতার আনন্দে অংশগ্রহণ করেছিল। এবং অন্য ভাষাভাষি ও জাতিগোষ্ঠীর স্বাধীনতাকেই নিজেদের স্বাধীনতা অর্জন বলে মনে করেছিল। বাঙালি হিন্দু, হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তানের স্বাধীনতাকেই নিজের স্বাধীনতা অর্জন বলে আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল। বাঙালি মুসলিম, ইসলাম উর্দু পাকিস্তানের স্বাধীনতাই নিজের স্বাধীনতা অর্জন বলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিল। পরপর দুটি দিনে। ১৯৪৭ সালের ১৪ই ও ১৫ই আগস্ট।

না, বাঙালি মুসলিমের ভিতরে যারা বর্তমান বাংলাদেশের বাসিন্দা। তারা আজ আর ১৪ই আগস্টকে তাদের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে মানে না। ইতিহাসের পাতা থেকে তারা তাদের সেই মারাত্মক ভুলকে শুধরে নিয়েছে ১৯৭১ সালেই। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল। এই চব্বিশটা বছর কিন্তু তৎকালীন পূর্ব বাংলার অনেক বাঙালি মুসলিমই ইসলাম উর্দু পাকিস্তানের খোয়াবে বিশ্বাসী থেকে ক্রমাগত নিজ জাতি ও দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে গিয়েছে নিরন্তর। তাদের বংশধরদের একটি অংশ আজও স্বাধীন বাংলাদেশকে আবার ইসলাম উর্দু পাকিস্তানের অধীনে ফিরে পেতে চায়। আজকের বাংলাদেশে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে সামগ্রিক ভাবে গোটা বাংলাদেশ সজাগ ও সতর্ক। কিন্তু ১৯৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাসে বিষয়টা এমন স্পষ্ট ছিল না। সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির অনেকেই বিশ্বাস করতো, তারা আগে পাকিস্তানী। তারপর মুসলিম এবং সব শেষে বাঙালি। ঠিক যেমন কাঁটাতারের এই পারে আপামর বাঙালি হিন্দু বংশ পরম্পরায় বিশ্বাস করে, তারা আগে হিন্দুস্তানী। তারপর হিন্দু এবং সব শেষে বাঙালি। একশ জন বাঙালি হিন্দুকে তারা আত্মপরিচয়ের শিকড় সম্বন্ধে প্রশ্ন করলে অধিকাংশই এই একই উত্তর দেবে। কেউ হয়তো বলবে তারা আগে হিন্দু তারপর হিন্দুস্তানী। এইটুকু যা তফাৎ। সে যাই হোক। আমাদের আলোচনা বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস নিয়ে।

১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগে পূর্ব বঙ্গের মুসলিম বাঙালি মনে করেছিল সব মুসলিম এক জাতি। তারা বিশ্বাস করেছিল পূর্ব বঙ্গের মুসলিম মাত্রেই পাকিস্তানী। যেমন হিন্দু মাত্রেই হিন্দুস্তানী। ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক উন্মাদনায় জাতিসত্বার সজ্ঞাতেই বিভ্রম এসে দেখা দিয়েছিল। না, সেটি শুধু বাঙালি মুসলিমের ক্ষেত্রেই ঘটেনি। বাঙালি হিন্দুর ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। তফাৎ শুধু এইখানে। ১৯৭১ সালে বাঙালি মুসলিম তার হারানো সম্বিত ফিরে পেয়ে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল যে, বাঙালি মুসলিম কখনোই পাকিস্তানী নয়। হতেই পারে না। বাঙালি মুসলিমের একটাই পরিচয়। সে প্রথমত এবং সর্বতো বাঙালি। পাকিস্তান তার স্বদেশ নয়। উর্দুভাষী পাকিস্তানীরা বাঙালির স্বদেশী আপনজন নয়। উল্টে তারা বাঙালিকে পরাধীন করে তাকে শোষণ করতেই বদ্ধপরিকর। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলিমের এই চেতনার সুত্রপাত ১৯৪৮ সালেই। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সেই চেতনা এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য লাভ করে। যার সুফল ১৯৭১ সালের স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ভিতর দিয়ে সত্য হয়ে ওঠে। ভারতের আসামে ১৯৬১ সালের বাংলাভাষা আন্দোলন যে তাৎপর্য অর্জন করতে সক্ষম হয় নি। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে সেই তাৎপর্য দানে সফল হয়। এখানেই বাহান্নোর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য।

১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার প্রসঙ্গ ওঠে। তখনই উর্দু রাষ্ট্রভাষা হিসাবে সংবাদ শিরোনামে উঠে আসে। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান সৃষ্টিতে আনন্দে আত্মহারা বাঙালি কল্পনাও করতে পারেনি, সাধের পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলার বদলে উর্দুকে মেনে নিতে হবে। আপামর উর্দু না জানা বাঙালি মুসলিম এবং পূর্ব পাকিস্তানে তখনো থেকে যাওয়া বিপুল সংখ্যাক বাঙালি হিন্দুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এরপর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দু চাপিয়ে দিলে বাংলাভাষী মুসলিম ও হিন্দু জনগণ আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়ে। তারা বুঝতে পারে, রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে তাদের জীবন ও জীবিকার উপরে অন্ধকার নেমে আসবে। শিক্ষা অর্জন, চাকরী ও ব্যাবসাবাণিজ্য এবং পেশাগত সব দিকেই বাঙালি হয়ে যাবে অবাঙালি উর্দুভাষীদের দাসানুদাস। এই বোধ তাদের ভিতর জেগে উঠতেই তারা সেদিন উপলব্ধি করতে পারে, উর্দুভাষী পাকিস্তানী মুসলিম বাংলাভাষী বাঙালি মুসলিমের আত্মজ নয়। হতেই পারে না। তারা বিদেশী। তারা স্বদেশী নয়। বাহান্নোর ভাষা আন্দলোন এই প্রথম বাঙালির অবরুদ্ধ চেতনায় স্বদেশ ও স্বজাতি সম্বন্ধে স্পষ্ট আলো ফেলতে সমর্থ হলো। বাংলার ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিঘাত। এই অভিঘাত সৃষ্টি না হলে কোনদিনই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্মই হতো না। আজকের বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য হয়েই পড়ে থাকতো। আজকের পশ্চিমবঙ্গের মতো।

কিন্তু বাঙালি মুসলিমের অবরুদ্ধ চেতনা জেগে ওঠার সেই পর্বেও এক শ্রেণীর ক্ষমতাবান বাঙালি মুসলিম নিজেদেরকে উর্দুভাষী পাকিস্তানী মুসলিম পরিচয়ে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর ছিল। তারা চলনে বলনে ব্যবহারে নিজেদের উচ্চস্তরের খাঁটি মুসলিম ভাবতে শ্লাঘাবোধ করতো। এবং নিজেদেরকে পাকিস্তানী পরিচয়ে তুলে ধরতে তারা পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসক গোষ্ঠীর পাদোদক খেয়ে বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতায় সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নেমে আসা পশ্চিম পাকিস্তানের ভয়াবহ ও নির্মম আগ্রাসন শোষণ ও নিপীড়নের স্বপক্ষে তারা গোটা বাঙালি জাতির অন্যতম শত্রু হয়ে দেখা দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এরাই রাজাকার নামে পরিচিত। পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে হাত মিলিয়ে এরা লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুকে হত্যা ও নিপীড়ন করে গিয়েছে কয়েক দশক ব্যাপি। তারা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বেই বিশ্বাসী ছিল না। তাদের কাছে বাঙালি মুসলিম মানেই পাকিস্তানী। এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু। এটাই ছিল সেদিনের পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিমের বিশ্বাস।

রাজাকার গোষ্ঠী ছাড়াও সেদিনের পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানপন্থী বাঙালির সংখ্যাও খুব একটা কম ছিল না। তারা রাজাকারদের মতো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর হয়ে কাজ করতো না যদিও। তবে তাদেরও দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, বাঙালি মুসলিমের আসল পরিচয় পাকিস্তানী। এবং পাকিস্তানই তার স্বদেশ। এই পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিমদের কাছে সেদিনের পাকিস্তানে লাহোর করাচীতে স্থায়ী ভাবে বাড়িঘর করে বসবাস করতে পারাও ছিল বিশেষ শ্লাঘার বিষয়। এবং পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাঙালির নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র দেশের কথা কল্পনা করাও ছিল এদের কাছে দেশদ্রোহীতার সামিল। তাই সেই সময়ের স্বাধীনতাকামী বাঙালিদেরকে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী বলেই চিহ্নিত করতো। এবং তাদের একান্ত প্রয়াস ছিল যেভাবেই হোক উর্দুভাষী পাকিস্তানীদের নেক নজরে জায়গা করে নেওয়া। বাংলা ভাষা মাতৃভাষা হলেও, তাদের কাছে উর্দুই ছিল কাজের ভাষা। সময়ের ভাষা। আধুনিকতার ভাষা। যোগাযোগের ভাষা। আভিজাত্যের ভাষা। এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। সেদিনের পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিমদের চেতনার জগৎ এইভাবেই গড়ে উঠেছিল। এবং তারা এই মানসিকতাকেই দেশপ্রেম বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করতো ও লালন পালন করতো। সৌভাগ্যের বিষয়, সেদিনের পূর্ব পাকিস্তানে এদের সংখ্যা শতাংশের হিসাবে খুব বেশি ছিল না। রাজাকারদের সংখ্যার সাথে যোগ করলেও এই পাকিস্তানপন্থীরা সেদিনের পূর্ব বঙ্গে সত্যই সংখ্যালঘু ছিল। আর ছিল বলেই দেশটি একাত্তরে স্বাধীনতার মুখ দেখতে পেয়েছিল। কিন্তু সংখ্যালঘু হলেও তাদের অভিঘাত কম ছিল না। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধটা শুধুই পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসনের সাথে হয় নি। সেদিনের মুক্তিযুদ্ধটা লড়তে হয়েছিল স্বদেশী পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিম গোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্বের পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস তাই এই পাকিস্তানপন্থী সংখ্যালঘু বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় সাথে পূ্র্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী বাঙালি মুসলিম ও হিন্দুর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ইতিহাস। দেশনায়ক বঙ্গবন্ধুর ঢাকা রেসকোর্সের সেই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পূর্ব মুহুর্ত পর্য্যন্তও পাকিস্তানপন্থীদের সাথে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামীদের দ্বন্দ্বের ধারাটি ঐতিহাসিক ভাবে তুল্যমূল্য ভারসাম্যের অবস্থানে বহমান ছিল। কারণ তখনও অধিকাংশই মনে করছিল, নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের ক্ষমতায় স্বীকার করে নিলেই, এবং বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হতে দিলেই বাংলাদেশের স্বতন্ত্র স্বাধীনতার প্রয়োজন দেখা দেবে না। সেটি ঘটলে আসলেই কিন্তু জিত হতো পাকিস্তানপন্থী বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়েরই। বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানেই ছিল পাকিস্তানপন্থীদের সমস্ত বিশ্বাসে শীলমোহর পড়া। এই সত্যটুকু অনুধাবন না করতে পারলে ঐতিহাসিক ভুল হবে। রেসকোর্সের ঐতিহাসিক ভাষণের আগে অধিকাংশ বাঙালিই কিন্তু শান্তিপূর্ণ পথে নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠানের আশায় দিন গুন ছিল। পাকিস্তানের সাথে সম্মুখ সমরে সামরিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে দেশকে স্বাধীন করার মতো মানসিক প্রস্তুতি অধিকাংশ বাঙালিরই ছিল না। তাদের কাছে পাকিস্তানের শাসনভার আওয়ামী লীগের হাতে আসাটাই ছিল প্রথম লক্ষ্য। একবার সেই লক্ষ্য পূরণ হয়ে গেলেই, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করার দরকার হতো না। অনেকেই এই সত্যটা আজও এড়িয়ে যান। বর্তমান বাংলাদেশের সৌভাগ্য ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আগে সেই রকম কোন অঘটন ঘটেনি। উল্টে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকশ্রেণী বাঙালিকে দমন নিপীড়ন করে দমিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দুই নৌকায় পা না রেখে একটি নৌকা বেছে নেওয়া সুবিধাজনক হয়েছিল। খুব ভালো করে গভীর ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের আগে অব্দি বঙ্গবন্ধু কোনভাবেই সম্পূর্ণ স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনের পথে যেতে চাননি। তিনি পাকিস্তানের সংবিধান মেনেই গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার লক্ষেই এগিয়ে ছিলেন। ফলে তিনিও প্রকারন্তরে পাকিস্তানপন্থীদের মতোই পাকিস্তানকেই বাঙালি মুসলিমের স্বদেশ বলে মেনে নিয়েই এগোচ্ছিলেন। তফাৎ শুধু, তিনি বাঙালির স্বাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এইখানেই তিনি পাকিস্তানপন্থীদের থেকে স্বতন্ত্র। পাকিস্তানপন্থীরা বাঙালি মুসলিমের স্বাধিকারেও বিশ্বাসী ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধিকার বোধকে জাগ্রত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর তাঁর সেই সাফল্যই রেসকোর্সের ৭ই মার্চের ভাষণকে ঐতিহাসিক করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধিকার বোধে জেগে ওঠা বাঙালি মুসলিমের মানসপট থেকে পাকিস্তানপন্থাকে তিনি একটি ভাষণেই অপসারিত করে দিতে পেরেছিলেন। অধিকাংশ বাঙালি মুসলিম ও হিন্দু সেদিনের ভাষণের পর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে সত্য বলেই বিশ্বাস করতে সাহস অর্জন করেছিল। সেই সাহস অর্জন না করতে পারলে, তারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতো না। তারা তখনও বসে থাকতো পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে নির্বাচনের ভিতর দিয়ে পৌঁছানোর জন্যেই।

ফলে একদিকে পাকিস্তানকেই নিজের স্বদেশ মনে করা আর অন্যদিকে বাঙালির স্বাতন্ত্র্য স্বাধিকারবোধের জাগরণে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু করা। এই দুইয়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে তৎকালীন পূর্ব বাংলার বাঙালিকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এর কালপর্বে। সংখ্যালঘু পাকিস্তানপন্থীদের শক্তিকে পরাস্ত করে স্বদেশের স্বাধীনতা আনতে অধিকাংশ বাঙালির স্বতন্ত্র বাঙালিয়ানার স্বাধিকারবোধ জাগ্রত করার প্রক্রিয়টি মোটেই সহজ ছিল না। বাঙালি হিন্দু মুসলিমের ভিতরে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী চেতনার বংশ পরম্পরার ঐতিহ্য এমনই সুদৃঢ় যে, সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তায় অধিষ্ঠিত করা অত্যন্ত কঠিনতম কাজ। বাংলাদেশের জন্মলগ্নের ইতিহাস আসলেই সেই কঠিনতম কাজটির এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত। যার ফলে দুই টুকরো বাংলার একটুকরো আজ স্বাধীন সার্বোভৌম বাংলাদেশ রূপে সারা বিশ্বে পরিচিত। যে দেশের প্রতিটি নাগরিক আজ স্বাধীন। এবং বাঙালি জাতির একজন হিসাবে গর্বিত। এই যে নিজের জাতিসত্তায় পরিচিত হওয়ার গৌরব। ঠিক যেমন একজন ব্রিটিশ একজন আমেরিকান একজন ফরাসী একজন জার্মান একজন গ্রীক একজন রুশ একজন জাপানী প্রভৃতি স্বাধীন দেশগুলির প্রতিটি মানুষ অনুভব করতে পারে। সেই অনুভুতির মাহাত্ম্যই আলাদা। আজকের বাংলাদেশের বাঙালি মাত্রেই তাই এইসকল দেশগুলির মানুষদের সাথে সমান মর্য্যাদায় পরিচিত। তাকে আর মিথ্যা বানিয়ে তোলা পাকিস্তানী পরিচয়ের পাসপোর্ট কিংবা ভোটার কার্ড নিয়ে ঘুরতে হয় না। সেই বিরম্বনার হাত থেকে বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। বাঙালির ইতিহাসে তাই বাংলাদেশের বাঙালির স্থান অনন্য এবং স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল।  

১৮ই ডিসেম্বর’ ২০২০

কপিরাইট শ্রীশুভ্র কর্তৃক সংরক্ষিত