অমিত্রজিৎ নাগ




গুচ্ছ কবিতা




১) ইন্টারসিটি


যারা ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে প্রায়ই যাতায়াত করে
তারা অভিজ্ঞ, পাঁচফোড়নের মত
ভরসা করলে তারা ভিজে বর্ষার সন্ধেয়
তোমার জন্য নীল গদি মোড়া সিট ছেড়ে দেবে;
তাদের হাঁটু পর্যন্ত গোটানো পোশাকের নীচে থাকা কাদা
নিছক রাস্তার হাজারখানেক ধুলোর তাল নয়,
প্রথমে কয়লা, তারপর সামান্য বিদ্যুৎ
ভেজা-পচে-যাওয়া দড়ি ধরে সন্তর্পণ টানাটানি
ঠিক কতটা ওজন টেনে তোলা হয় ওপরে ওরা জানে না
দড়ি ছিঁড়ে গেলে মৃত্যু, অথবা যদি কাজে ব্যর্থ হয়
আকাশ সমান উচ্চতায় একশো-হাজার আলো তুলে রেখে আসে তারা
সেই প্রতিটা আলো তাদের নিজেদের গায়ে ছেঁকা দিয়ে পরখ করা
সন্দেহ থাকে না, ওরা কোনো সন্দেহের সুযোগ দেয় না|
হাসতে হাসতে ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ধরে ফিরে যায়
একটু ঘুম, একটু শক্তি গুছিয়ে নেওয়ার আশায়|
ভরসা দিয়ে যদি শুনতে পারো তবে দেখবে
ওদের কাগজের নৌকো ভিজে নেতিয়ে গেলেও হেরে যায় না
যদি না তোমরা না বলে হঠাৎ ম্যানহোল খুলে দাও|







২) আলো, জল এবং এক অনন্ত ঝর্ণা
      

এক সমুদ্র জল আর রাশি রাশি আলো
হঠাৎ একদিন কেউ যেন বলেছিল
এদের মধ্যে কি কোনো তফাৎ পাও?
না, সত্যিই যেন আলোর ঝর্ণায়
জলের স্রোতের টানে
দুই সৌরজগতের মত সাদৃশ্য,
শান্ত রাত যেন এক তপস্বী
বিক্ষুব্ধ সমুদ্রকে দিনের আলোর ধারাস্নানের আশীর্বাদ এনে দেবে
সেই অভিপ্রায়ে সমুদ্রের সামনে অসংখ্য নক্ষত্রের আলো ধরে,
দিনের সীমাহীন আলোর সাম্রাজ্য
অপেক্ষা করে কখন তার ওপর ঝড় উঠবে
যে ঝড় গভীর সমুদ্র সঞ্চয় করে রাখে|
আমি সত্যিই তাকে খুঁজি নিয়ত;
এই সমুদ্রের, এই আলোর গোপন ভান্ডারে
যার শুরু বা শেষ নেই সেখানেই কি
সে আত্মগোপন করে?








৩) অপেক্ষা এবং সময়
   

উত্তর থেকে দক্ষিণ সার বেঁধে
কিছু পাখি উড়ে চলে গেল, আর
উড়ে গেল কিছু অপেক্ষা|
এক বন্ধু, অথবা কোনো ক্ষণিকের অতিথি
এখান দিয়েই নীল সীমান্ত পেরিয়ে যাবে কথা ছিল
হয়ত পেরিয়েও গেছে কিন্তু
সমস্ত অপেক্ষা পেরোনোর পর,
যখন আমি কোনো অন্ধকার ঘরে সাধনা করছি
আমার অনুপলব্ধ অতীতকে|
হয়ত সময় হঠাৎ চেয়ে বসেছে যাতে কিছুটা
পিছনে ফিরতে পারে
যেখানে সত্যি সত্যিই সময়ের টানে সবকিছু
সংকুচিত হয়ে আসবে,
ক্ষুধার্ত শিশু ফিরিয়ে আনতে পারবে তার
জন্মকালের প্রতিজ্ঞা
দুবেলার খাবার দুঃখের আগুনে শুকিয়ে উঠবে না
বন্যার জল নিজেই ফিরে যাবে আকাশের গর্ভগৃহে|
হয়ত কোনো সেই জাদু, বা ক্রিস্টাল
কিছু ছিল নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই ছুঁয়ে যেত আমার আকাশ,
শুধু অপেক্ষারা উল্টো স্রোতে চলতে পারল না বলে
আমায় নিষ্ফল থাকতে হল
আমার অন্ধকার গবেষণাগারে|






৪) প্রিজম


একটা টুকরো কথা বলি,
অনেকদিনই বলতে পারতাম কিন্তু
বলার আগেই কিছু দ্বিধা এসে বসে পাশে
প্রিজম থেকে ভেঙে ভেঙে|
কথাটা সবাই বলে
নিজের নিজের জীবদ্দশায়
অথচ কেউ শেষপর্যন্ত মেনে নিতে চায় না|
অথচ এটা কি সত্যি নয় যে
আমাদের কোনো তফাৎ নেই?
আমরা ভোর হতে যা দেখি
বৃষ্টিতে যতটা ভিজি তাতে তফাৎ করতে গেলেই
ঐ প্রিজমটা সামনে এসে পড়ে|
এই টুকরো কথাটা আমরা সবাই জানি
শুধু শিখি নি কোনদিক থেকে প্রিজমটা ধরব,
শিখি নি যে প্রিজমের যে দিক থেকেই দেখি
রঙিন বা সাদা
আসলে জীবনটা একই|