তন্ময় ধর


পায়ে পায়ে পিপলডালি
           


সংসারের কোলাহল থেকে বহুদূরে হিমালয়ের গভীরে কোন এক অজানা গ্রামে গিয়ে কয়েকদিন বসবাস করার ইচ্ছে সবার মনের কোণেই থাকে। চোখের সামনে শুধু থাকবে হিমালয়ের তুষারধবল শৃঙ্গগুলি, কানে শুধু বাজবে দেবতাত্মার বাতাসের গুঞ্জন আর পিছনে বহুদূরে ধূসর কুয়াশার মত পড়ে থাকবে মানুষের সংসারের কোলাহল। সেখানে পৃথিবীর কোন নিয়ম থাকবে না, সময়ের কোন স্পর্শ থাকবে না। সে স্বর্গলোক যেন বৌদ্ধ দর্শনেরশম্ভালা’, যেন হিন্দুদর্শনেরব্রহ্মলোক 

বড়কোট থেকে রওনা দিয়েছিলাম ভোরেই। পথে ধরাসু বাঁকের ভয়ঙ্কর ধস এলাকা থেকে যাত্রাসঙ্গী হল তুমুল বৃষ্টি। এপ্রিল মাস। হিমালয়ের হিম-পরিসরে বসন্ত শুরু না হলেও বৃষ্টির সময় নয় সেটা। তবু পশ্চিমী ঝঞ্ঝার প্রভাবে নেমেছে প্রবল বৃষ্টি। দূরের পাহাড় দেখা তো দূরের কথা, মেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশার দাপটে কয়েক হাত দূরের দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে না পৌরাণিক সিনেমায় যেমন স্বর্গের দৃশ্য হয়, মনে হচ্ছে, তেমনই এক দৃশ্যের মধ্য দিয়ে ইন্দ্রের দিব্যরথে চড়ে চলেছি। সারথি মাতলি হঠাৎ করে ব্রেক চাপলেন। পথের পাথরের টুকরোর আঘাতে গাড়ির টায়ার ফেঁসেছে। বৃষ্টির মধ্যেই নামতে হল গাড়ি থেকে। চাকা বদলানো ছাড়া উপায় নেই। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে সব ঠিকঠাক করে আবার যাত্রা শুরু হল অচিনপুরের দিকে। 

বৃষ্টি আর ঠান্ডা হাওয়ার বিরাম নেই। সুতরাং জৌগাথ নামক ছোট্ট পাহাড়ী জনপদের ছোট্ট একচিলতে দোকানে বসে একটু গরম চা। দোকানদার এবং তাঁর বন্ধুরা বড়ই অতিথিবৎসল। চায়ের সঙ্গে সুস্বাদু পকোড়া জুটতে তাই দেরি হল না।তাউজি, ইয়ে রাস্তে মে কোই চলতা নহীঁ হ্যায় ক্যয়া?  রাস্তে মে দো ঘন্টে মে কোই গাড়ি তো দূর, এক ভী ইনসান দিখাই নহীঁ দিয়াআমি জিজ্ঞাসাই করে বসলুম। হাসলেন দোকানদারআব তো সিজিন নহীঁ হ্যাঁয় বাবুজি। আগলে দো ঘন্টে মে ভী অ্যায়সা হি মিলেগাদাম মিটিয়ে চলতে শুরু করলাম। সামনে সত্যিই গাছ-পাথর ছাড়া কিছু নেই। নিশ্চুপ, অচল, ধ্যানমগ্ন এক জগৎ। বহুদূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক শুধু প্রাণের সংকেত বয়ে আনছে। মাঝে মাঝেই নেমে রাস্তা থেকে পাথরখন্ড তুলে সাফ করে এগোতে হচ্ছে। সকাল থেকে সত্যিই এপথে কোন পদচিহ্ন পড়ে নি। 



দেরি হয়েছে, শরীর ক্লান্ত, তবু অ্যাডভেঞ্চার ছাড়ছি না। সড়কপথের ধারে খাড়াই বেয়ে কখনো নীচে নেমে দেখে আসছি নাগরাজা মন্দির। সে নামা-ওঠা সহজ নয়। আধা-ঝুলন্ত পাথরখন্ড ধরে শ্যাওলা-মাখা নড়বড়ে পাথরে সাজানো সে পথ বড়ই দুর্গম। কত যে নাগদেবতার মন্দির এ পথে। তীর্থযাত্রীর ভিড় একেবারেই নেই। নিরিবিলি মন্দিরপ্রাঙ্গণ থেকে দূরে তাকালেই বরফমাখা দেবতাত্মা হিমালয়ের প্রশান্ত ছবি। কখনো সেই তুষারশৃঙ্গগুলিতে মেঘ-ভাঙা সোনালী আলো পড়ে, কখনো কুয়াশার পাতলা চাদরে ঢেকে যায়। একের পর এক স্বর্গীয় দৃশ্য দেখতে দেখতে নিজের ভেতরকার দেবত্বে শিহরণ জাগে আবার পথ চলি। ব্রহ্মনাথের মন্দিরে আবার থামি। উত্তর ভারতীয় নাগর স্থাপত্য থেকে অনেক আলাদা নতুন এক মন্দির। পুরোহিত অবশ্য এর প্রাচীনত্বের এক দীর্ঘ গল্প শুনিয়ে দেন। আরো এগিয়ে হালেত গ্রামে লোকায়ত দেবতা হালেতের মন্দিরে আবার থামলাম। 

পথ ভুল হল আমাদের। বৃষ্টি থেমে এসেছে ততক্ষণে। তিনদিকে বিভক্ত হয়েছে পথ। কোন পথে যেতে হবে, কাকে জিজ্ঞাসা করব? শুধু হিমালয়ান ম্যাগপাই- হুইসলিং থ্রাসের ডাক আর অজানা বৃক্ষের মর্মরধ্বনি ছাড়া আশেপাশে কিছু নেই। দুই পথচারীকে যখন পাওয়া গেল, ততক্ষণে আমরা ভুল পথে প্রায় বারো কিলোমিটার পেরিয়ে এসেছি। পাহাড়ী স্কুলের দেবশিশুরা টা-টা করে বিদায় দিল। পেটে ততক্ষণে ছুঁচো ডন মারতে শুরু করেছে। কতদূর আর কতদূর? কতদূরে ব্রহ্মলোক, শম্ভালা, যেষ্টিহা মুহুর্ত, অমিতৌজা পর্যঙ্ক, অচিনপুর, দিকশূন্যপুর? ব্রহ্মলোকে ক্ষুধা-তৃষ্ণা নেই বলেই বোধহয় এপথে খাবারের কোন রেস্তোরাঁ নেই। 

সেম নাগরাজার মন্দিরে গিয়ে বেশ কিছু তীর্থযাত্রীর দেখা পাওয়া গেল। মন্দিরের চত্বরে প্রাচীন লোকায়ত ধর্মবিশ্বাসের চিহ্ন। হিমালয়ের বুকের শব্দ ধরে রেখেছে এই প্রাচীন দেবতারাই, সে মন্দিরের বহিরঙ্গ যতই আধুনিক হোক না কেন। বহুদূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অমোঘ বিশ্বাসে প্রায় একশো মাইল পাহাড়ী রাস্তা হেঁটে এসেছে মানুষ। কোলে প্রায়-সদ্যোজাত সন্তান। এক অসীম বিশ্বাস এনে নিবেদন করে যাচ্ছে অসীমের চরণে। 

এরপরের পথ আর পৃথিবীর মানচিত্রে নেই। দূরে টিহরী গাড়ওয়ালের বিলঙ্গনা নদীর নীল আভা, পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপ, মেঘ আর আকাশের রূপ মিলেমিশে নয়নসৌভাগ্য রচনা করে চলেছে নিরন্তর। নদী কখনো পথের ধারে এসে প্রায় ছুঁয়ে দিচ্ছে, কখনো দূরে গিয়ে মেঘ-কুয়াশার রূপকথার সাথে লুকোচুরি খেলছে। পথে কত মন্দিরে লোকায়ত দেবতা চেয়ে রয়েছেন তৃষিত চোখে। কিন্তু খালি পেটে কোন ধর্মই সইছে না। 



পিপলডালির সুবিখ্যাত সেতু চোখে পড়ল আরেকটু এগোতেই। বাঁদিকের গ্রামীণ রাস্তা ধরে নেমে গেলাম পাহাড়ী গাঁয়ে। পৃথিবী থেকে যেন বহুদূরে বহুকালের যাত্রা সেরে উপস্থিত হয়েছি এমন একটা দিনে, এমন একটা জায়গায় যা মহাকালের জপের মালায় নেই। পাথরের টুকরোয় সাজানো সে ঘরের দেওয়াল এবং ছাদ। পুরনো কাঠের গায়ে নকশা করা দরজা-জানালা। ঘরের মালিক চওড়া হাসি হাসলেন। ড্রাইভারের পরিচিত তিনি। সারাদিন অপেক্ষা করেছেন আমাদের জন্য। মধ্যাহ্নভোজের সময় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তবু তাঁর সনির্বন্ধ অনুরোধ উপেক্ষা করা গেল না। পেট খিদেয় জ্বলছিল। রাজকীয় আয়োজন করেছেন গৃহস্বামী। বেশীরভাগ পদ দেখা তো দূরের কথা, নামও কখনো শুনি নি। মেথি-পালং আর হরেক হিমালয়ান মশলা মেশানো কাফুলি, বিভিন্ন রকম পকৌড়া, পাহাড়ী চালের তৈরি ফানু, কান্দালি শাক, মান্ডোয়ার পরোটা, মাষকলাই ডালের মশালাদার চেনসু, ঝাঙ্গোরার সুস্বাদু ক্ষীর- রান্নাঘরের অক্ষয় ভান্ডার থেকে একে পর এক খাবার আসছে তো আসছেই। এঁটো হাতেই প্রায় হাত-জোড় করতে হলতাউজী, মাফ করুন। বাঙালী পেটে এর বেশী আর সইবে না 

তাউজী হাসেন। গল্প করতে করতে আর অচেনা ফুল-ফল-পাখি-গাছপালা বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যায়। বহুদূর কলকাতা থেকে গিয়েছি, শুনে গ্রাম থেকে অনেক মানুষ এলেন আড্ডা দিতে। রডোড্রেনড্রন বা বুরাঁশের সরবৎ খেতে খেতে জমে উঠল গল্প। হিমালয়ের নীলকন্ঠ পাখির ডানার মত নীল সতেজ এক মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেমের ট্রাজিক রূপকথার পর জনা কয়েক শেরপা তাদের পূর্বপুরুষের কাহিনি নিয়ে হেঁটে চললেন বরফ-মাখা পাহাড়ের ভিতর দিয়ে। গোটা হিমালয় তখন স্তব্ধ। দূরের পাহাড়চুড়োর ভাঙা মন্দিরে, মেঘে, বৃষ্টিরেখায় এক স্বর্গীয় জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ছে। মহাবিশ্বের কোথাও এ আলোর তুলনা নেই। পৃথিবীতে, স্বর্গে, ব্রহ্মলোকে, শম্ভালায়ও বুঝি এমন অপার সৌন্দর্য্য দুর্লভ। স্বর্গের শিল্পীর ক্যানভাসের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে গল্প শুনে চলেছি। দেবতাত্মার সফলতম শিল্পী নিকোলাস রোয়েরিখ তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে হেঁটে চলেছেন মধ্য হিমালয়ের এক দুর্গম পথে। পার্থিব চেতনার স্তর একে একে পার হয়ে ক্ষুরধার সেই পথ আলো থেকে আরো আলো হয়ে উঠছে। আলোকিত সোপান ধরে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষের স্মৃতিহীন সত্তা...উদ্বংশমিব যেমিরে... বহু পিছনে রক্তবর্ণ কুয়াশার মত পড়ে রয়েছে মানুষের সংসার গোধুলি। 

৬ দিন বাদে শিল্পী ফিরে এলেন সংসারে। স্মৃতি নেই কোন। ৬ দিনের ডাইরির পাতা ফাঁকা। সঙ্গের শেরপারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে সবার শরীরে পবিত্র এক পদ্মের গন্ধ। খিদে নেই, তৃষ্ণা নেই। গল্প শুনতেই শুনতেই গরম গরম মক্কার রুটি আর চিত্রক রাজমার তরকারি দিয়ে নৈশভোজ জমে ওঠে। বৃষ্টিমাখা জ্যোৎস্নায় একের পর এক রূপকথা যেন যুগ-যুগান্তের পথ পেরিয়ে যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়ে। এখানে কালের প্রভাব নেই থাকতে পারে না। সারারাত পাতা চুঁইয়ে ঘরের চালে বৃষ্টির জলের লঘুসঙ্গীত চলে। 

ভোর হয় একসময়। সে মায়াময় সোনালী আলোর বর্ণনা দেওয়া আমি তো দূর অস্ত, স্বয়ং হিরণ্যগর্ভেরও অসাধ্য। দেবশিশুরা হাসি হাসি মুখ নিয়ে রওনা দিচ্ছে দূর পাহাড়ের স্কুলের পথে। আমারও স্বর্গবাসের মেয়াদ ফুরিয়ে আসে। রুকস্যাক গুছিয়ে নিয়ে পথে নেমে পড়ি। গ্রামবাসীরা কিন্তু পথ আটকালেনআজকের দিনটা থেকে যেতেই হবে। শুধু আপনার জন্যজাগরলোকনৃত্যের আয়োজন হয়েছে আজ সন্ধ্যেয়। দূর গ্রাম থেকে ৫০ জন নৃত্যশিল্পীর দল আসছে এই বৈশাখ মাস নাচের সময় নয়। তবু নাকি নৃত্যশিল্পীদের অনেক কষ্টে রাজী করানো হয়েছে। শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। ক্ষুদ্র মানুষ আমি। আমার জন্য এত আয়োজন! অতিবৃহতের কোলে দাঁড়ানো বিশালহৃদয় ওই মানুষগুলোর সামনে বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কি বলব? কিভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব? 

দুপুরে আবার গাড়ওয়ালী মধ্যাহ্নভোজের রাজকীয় আয়োজন। নতুন নতুন সব পদ চুরকানি, কোড়ার রুটি, হরেক রকম ডাল দিয়ে তৈরি ফানা, তেলেভাজা মিষ্টি আর্সা, শিশুনাগের শাক আরো কত পদ, নাম শুনে বুঝতেও পারছি না। বিকেলে ছোট্ট ছোট্ট কৃষিজমিতে নিয়ে রাজমা এবং নানাপ্রকার শাকের চাষ দেখালেন তাউজি। আর সন্ধের আগে আগেই এসে হাজির হল নৃত্যশিল্পীর দল।জাগগরনাচের পরতে পরতে অলৌকিক এবং ধর্মীয় অনেক রহস্য আছে। স্থানীয় দেব-দেবী, ভূত, পরী এবং বিভিন্ন রূপকথার চরিত্র সেজে দাঁড়িয়ে গেলেন নৃত্যশিল্পীরা। ঢোল-কাঁসরের তীব্র আওয়াজের সঙ্গে শুরু হল এক জাদু-সঙ্গীত। এক অগ্নিবলয়ের চারদিকে ঘিরে শুরু হল নাচ। এরপর জাদুকর এক এক করে নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন নৃত্যশিল্পীদের। আদিম মন্ত্র উচ্চারণ করে একে একে ভূত তাড়ানো শুরু হল। মোহিত হয়ে দেখছি সব। যুগের ভিতর অন্য এক যুগে ঢুকে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। 

সে গানের রেশ স্মৃতিতে রইল বহুক্ষণ। তারপর কখন যে সেই মায়াময় জগৎ থেকে বেরিয়ে এসেছি, নিজেই জানি না। ভবিষ্যতে হয়ত আবার কখনো যাওয়া হবে সেই পথে। আমি জানি, ততদিন ওই পাহাড়, নদী, গাছপালা আর সেতু আমার অপেক্ষায় থাকবে। 
  
কিভাবে যাবেনঃ- সড়কপথে উত্তরকাশী থেকে ধরাসু, জৌগাথ, চৌধার, রাজাক্ষেত হয়ে আসতে পারেন পিপলডালি। বিকল্প পথে গাড়ওয়াল শ্রীনগর থেকে কীর্তিনগর, পোখাল, জাখধার হয়ে আসতে পারেন।