চ্যানেলের অফিসে মিটিং চলছে। সাউথ বম্বের কাঁচের দেওয়াল ঘেরা কনফারেন্স রুম—নিচে সমুদ্র, ভেতরে এয়ারকন্ডিশনের একটানা গুঞ্জন। ডানা বসে আছে টেবিলের এক পাশে। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে মুম্বই এসেছিল সিনেমা বানাবে বলে। সে স্বপ্ন সত্যি হয়নি। এখন সে সিরিয়ালের গল্প লেখে—লিখতে লিখতে তার নামডাকও হয়েছে, অন্ধেরি ওয়েস্টে নিজেদের ফ্ল্যাট, বর রাজীব অ্যাডফিল্ম বানায়, ছেলে ছোট- জুনিয়ার স্কুলে পড়ে। ছবির মতো জীবন , যেমন সিনেমায় দেখায় আরকি ! টেলিভিশন তাকে বসত দিয়েছে এই শহরে। চ্যানেলের ফিকশন হেড ডানার চেয়ারে সামনে এসে বলল— “IPL আসছে। সবাই ম্যাচ দেখবে। আমাদের সিরিয়াল কে দেখবে?” একটু থেমে— “Do Something drastic. Steroids দাও।” স্টেরয়েড মানে—ঘটনার ঘনঘটা। এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হেসে বলল— “ডানা, তোমার তো রেডি ফর্মুলা আছে— হিরোইনকে তুলে নিয়ে গিয়ে রেড লাইট এরিয়ায় বিক্রি করে দাও। তারপর রেসকিউ ট্র্যাক।” ঘরে হালকা হাসি পড়ে। আরেকজন বলে—“কতবার brothel করবে তুমি?”
ডানা অল্প হেসে চুপ করে যায়।
ডানার মনে পড়ে অনেক আগের এক সময়। তখন সে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। শহর কলকাতা। আশির দশকের শেষ। নন্দনে এসেছে Salaam Bombay!। বাড়িতে কাজের মাসি আসেনি,মা আর মাসিমনি সিনেমা দেখতে যাবে— ডানাকে রেখে যাওয়ার কেউ নেই। তাই তাকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেদিন। অন্ধকার হলঘর। নতুন এসি র ঠান্ডা হাওয়ায় ছোট্ট শরীরটা কুঁকড়ে আসছিল। ডানার ভালো লাগছিল না। পর্দায় এক অচেনা শহর। সে গল্পটা খুব ভালো করে বুঝতেও পারেনি! তবু কিছু ছবি থেকে গিয়েছিল মনের মধ্যে —রাস্তায় গরিব বাচ্চারা একা ঘুরছে, কেউ হঠাৎ চুরি করে দৌড়ে পালাচ্ছে, কারও চোখ নেশায় লাল, হাসতে হাসতে একদল বাচ্চা চটুল হিন্দি গানের সঙ্গে নাচছে, আর এক অল্পবয়সী মেয়েকে জোর করে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে— সে কিছু বলছে না। দেহটাকেও কেনাবেচা করা যায়— সেই প্রথম জেনেছিল ডানা। সবটা না বুঝলেও দৃশ্যগুলো তার মনে দাগ কেটে গিয়েছিল।
কিছুদিন পর— ডানাদের সল্টলেকের সরকারি আবাসনে পাশের বাড়িতে এলেন পপি গোস্বামী। সরকারি চাকরি করেন,
তবু আলাদা লাগত। বিকেলে কোচিং থেকে ফেরার পথে ডানা দেখত—স্লিভলেস ব্লাউজ, শিফন শাড়ি, ঠোঁটে লিপস্টিক পরে পপি বেরোচ্ছেন। এক এক রাতে এক একরকম গাড়ি থেকে তাঁকে নামতে দেখত ডানা। পপির ছেলে তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকত - মায়ের অপেক্ষায়। ডানা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত পপির দিকে। পাড়ায় ফিসফিস শুনেছিল — “ও ভালো মেয়ে না।” একবার পপি তার ছেলের জন্মদিনে পাড়ার বাচ্চাদের সবাইকে ডেকেছিলেন। কিন্তু কেউ যায়নি। ডানাও না।পরে শোনা গেল—ছেলেকে পপি হোস্টেলে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
তারপর কেটে গেছে অনেক বছর। কলকাতা ছেড়ে ডানা এখন পাকাপাকি ভাবে মুম্বইকর। ফেসবুকে কদিন আগে হঠাৎ একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেল সে — Riju Goswami। প্রোফাইলের ছবিতে ছেলেটির মুখ দেখে চিনতে পারে ডানা , মায়ের মুখ কেটে বসানো — পপির ছেলে। প্রোফাইলে ক্লিক করে এ ঋজুর এ ছবি ও ছবি দেখতে দেখতে ভেসে এল পপির ছবি। পপির মুখে বয়সের ছাপ, তবু চেনা যাচ্ছে । ডানা একটু ভেবে রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করে নিল।
“ডানা?”—ডাক আসে। মিটিংয়ে মন ফিরেয়ে আনে সে। হেসে বলে— “আমার স্কুলের কাছে সোনাগাছি ছিল। ছোটবেলায় ভাবতাম—ওদের জীবনটা কাছ থেকে দেখব।” কেউ হেসে ওঠে। “মুম্বই এসে একবার গিয়েছিলাম—কামাঠিপুরা ওয়াকে।”
একজন অবাক—“তুমি সত্যি গেছ?”
ডানার মনে পড়ে শীতের এক ভোর। গ্রান্ট রোড থেকে সোজা ল্যামিংটন স্ট্রিটের দিকে ঢোকা। জীবনটা এখানে আর পাঁচটা গলির মতোই এগিয়ে চলেছে। চায়ের দোকানে কেটলি ফুটছে—চা আর দুধের গন্ধ। একটা QR কোড ঝুলছে পাশে।ভেতরে— একটা বারান্দায় টবে তুলসী গাছ। একজন মহিলা দরজায় জল ছিটিয়ে ঝাঁট দিচ্ছেন। একটু দূরে এটিএম।
তারপর একটু ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটা বদলায়। কামাথিপুরার চোদ্দ নম্বর গলি। সারি সারি পুরনো ফ্ল্যাটবাড়ি— গায়ে গা ঠেকানো, ঘিঞ্জি। চারদিকে দেয়াল উঠে এসে আকাশটাকে সরু করে দিয়েছে। বারান্দায়, জানলায়— দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি মেয়ে। অতো সকালেও তারা তৈরি হচ্ছে। কেউ চুল বাঁধছে, কেউ ঠোঁটে রঙ লাগাচ্ছে, কেউ বা চুপ করে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে । একটা শব্দহীন প্রস্তুতি। সারি সারি জানলা। সারি সারি লোহার গ্রিল।একতলার এক জানলায়— গ্রিলের ওদিকে এক মেয়ে। চুল বাঁধতে বাঁধতে থেমে ডানার দিকে তাকায়। দৃষ্টিটা স্থির। তারপর আবার চুল বাঁধা শুরু করে। ডানা এগিয়ে এসে কৌতূহলে গ্রিলটা ছোঁয়। লোহার ঠান্ডা আঙুলে লেগে থাকে। মেয়েটি একটু অস্বস্তিতে সরে যায়।
ডানা হাত সরিয়ে নেয়। এক মুহূর্তের জন্য দু’পারের দূরত্বটা খুব
স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ডানার সেদিন ইচ্ছে ছিল ছবি তোলার কিন্তু মেয়েটির চোখ ডানাকে বুঝিয়ে
দিয়েছিল তারা ভিনগ্রহের বাসিন্দা নয় - কাজের বাইরে তাদেরও একটা জীবন আছে! লজ্জা
পেয়েছিল ডানা। ক্যামেরা বের করেনি। মনে রেখে দিয়েছিল শুধু।
⸻
ডানা ফিরে আসে মিটিং রুমে কেউ বলে— “Weekend-এ আমরা golf
খেলি…পার্টি করি ! আর তুমি ! ” আরেকজন হেসে— “তোমরা বাঙালিরা একটু বেশি intellectual
।” ডানা
হেসে ফেলে।
মেসেঞ্জারে মেসেজ। Riju। “আমি মুম্বইতে শিফট করেছি। মা’কে
নিয়ে একদিন আসতে চাই। আসতে পারি?”
ডানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর লেখে— “এসো।”
সেদিন বিকেলে বেল বাজে। ঋজু মাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে—পরিপাটি, ভদ্র। সে সরে দাঁড়িয়ে বলে— “মা, এসো —” পপি ঢোকেন। ভিতরে ঢোকার আগে আঁচলটা ঠিক করে নেন। হাতে শিরা স্পষ্ট, হাল্কা নকশি শাড়ি, পাটভাঙা। নুন মরিচ চুল , গায়ে সুন্দর পারফিউমের গন্ধ। তিনি ব্যাগ খুলে চকোলেট বের করে বলেন — “এগুলো তোমার ছেলের জন্য।” ডানার ছেলে লজ্জা পায়, তারপর হাসে। ঋজু মাকে বসতে বলে— “মা, বসো।” পপি বসেন, চারদিকে তাকান, তারপর গল্প শুরু হয়। পুরনো পাড়া , স্কুল, চেনা মানুষ- কতো কী ! মাঝে মাঝে হেসে ওঠেন— সেই হাসিটা ডানার চেনা। ঘরটা ধীরে ধীরে ভরে ওঠে।
ওরা চলে গেলে ডানার ছেলে চকোলেট খুলতে খুলতে বলে— “মা… দিদাটা কী ভালো, না?” ডানা তাকিয়ে
থাকে।
এক মুহূর্তে—অন্ধকার হলঘর, না-যাওয়া জন্মদিন, গ্রিল দেওয়া জানলা— সব একসঙ্গে এসে দাঁড়ায়। সে একটু থামে। তারপর বলে— “খুব ভালো।”
রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে ডানা। দু’হাত আলতো করে গ্রিলটা ছুঁয়ে। লোহার ঠান্ডা একই থাকে। আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। ডানা তাকিয়ে থাকে। তারপর— গ্রিলের এপার আর ওপার আলাদা করে আর চোখে পড়ে না।



0 মন্তব্যসমূহ