সমর্পিতা ঘটক

 



আমার মাতৃভাষায় ঘনিয়ে উঠছে তমসা

 

কেমন দরিদ্র হয়ে যাচ্ছি সব দিক থেকে। খণ্ডহারের মতো মনে হয় নিজেকে। খসে পড়ছে সব। ভাষা, আচরণ, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, ভিতরের প্রজ্জ্বলিত শিখা সব নিভে যাচ্ছে একে একে। এরপরই তো ঝড় ওঠে। কেঁপে ওঠে নয় কুঠরি। ফাঁক হয়ে যায় সব। ফাটল বিরাট বিরাট। আর সেই ফাটলে তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের লালিত সম্পদ যে সম্পদ আমরা পেয়েছি উত্তরাধিকারে, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্র-পরবর্তী কথাসাহিত্যিকদের নিরলস সাধনার ফসল হল আধুনিক বাংলা ভাষা। যা যা যাচ্ছে তাতো একেবারেই চলে যাচ্ছে ধ্বংসের পথে। আর তো ফেরত পাব না! এই যে এত শুনি, পড়ি, দেখি চতুর্দিকে, প্রত্যাশা রাখি না কিছুর তবু ভালো কথা কিংবা ভালো লেখা পড়লেও মনে হয় অনেকখানি পেলাম। কিন্তু ভাষার দুর্দশা ক্রমশ প্রকট। দুর্দশা, দৈন্য তো আছেই, সঙ্গে আছে ভ্রান্তি, অপসংস্কৃতির উপাদান, পেশি ফোলানো নৈরাজ্যের উদাহরণ আর মাতৃভাষাকে অবহেলা করার সব রকমের প্রলোভন।  

রাজনীতির ভাষা, মিডিয়ার ভাষা গ্রাস করছে সুকুমার মন এবং রোজকার জীবন। সবাই এখন আগ্রাসী পাশের জনের প্রতি। বেলাগাম সবাই। কুকথার স্রোত প্লাবিত করে সামাজিক মাধ্যম। দুঃসাহস দেখে চমকে চমকে উঠি। তারপরে দেখতে দেখতে আর শুনতে শুনতে... আর চমকাই না। রেওয়াজ হয়ে যায় সব। খারাপ কথা, মিথ্যে কথা, ভুল কথার পাহাড় জমে। সে পাহাড় ভাঙবে কবে? ধাপার মাঠের মতো জঞ্জাল স্তূপ। ধাপার কাছে এলে আগে যেমন নাকে রুমাল চাপা দিতে হত। গুলিয়ে উঠত গা। এখন সর্বক্ষণ গা গুলোয়। পেরনোর উপায় কই? এখন পথেঘাটে, বাসে, ট্রামে কথায়, আলোচনায় মশগুল মানুষ যোগ করে বিচ্ছিরি কিছু গালি যা আগে বলা যেতনা সর্বসমুখে। কত সাবলীল হয়ে গেছে এইভাবে কথা বলা, অবাক হই। ফেসবুকে কমেন্টে কত হুমকি থ্রেট, নোংরা কথার বিদ্যে জাহির করে রাজনৈতিক দলের পোষ্যরা। মঞ্চে নেতা, অভিনেতা হাতে মাইক্রোফোন পেয়ে গরল ছেটান। আর ভাষার ছোবল এবং গরল হাত পেতে নেয় ধুলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তগণ। কত শব্দের দুরকম মানে হয় আমরা জানলাম এই গত কয়েক বছরে। রাজনীতিতে যোগ হল সস্তা, অসংসদীয় বাজে কথা বলার প্রতিযোগিতা। কত নেতা বিচ্ছিরি শব্দ প্রয়োগ করে লাইমলাইট কেড়ে নিলেন। বাণিজ্যিক সিনেমার ব্যবহৃত  হিংসাত্মক সংলাপ রাজনৈতিক সংলাপের বিকল্প হয়ে গেল। মানুষ হাততালি দিল। বোম মারা, হাত কেটে দেওয়া, থাপ্পড় কষানো, খুন করা, পায়ের তল দিয়ে টিপে মেরা ফেলা এসব কথা প্রকাশ্যে বলেন নেতারা বিপক্ষ দলের মানুষদের বিরুদ্ধে। রাজনীতি করতে গিয়ে, নির্বাচনের আগে পরে, গোষ্ঠী বিবাদে এমনিতেই হাজার হাজার মানুষ খুন হচ্ছেন এ রাজ্যে প্রতিদিন। ছিন্নভিন্ন হচ্ছে শান্তি-সৌহার্দ্যের বাতাবরণ, তার ওপর আছে ভাষা সন্ত্রাস। হতাশ হয়ে পড়ি। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। নিরাময় খুঁজি। পরিত্রাণ চাই। মনে হয় সবাই যদি বোবা হত কি ভালোই না হত! ভাষা তখন থাকত অন্তরালে।

 

“বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠানে ঝরে রোদ

বারান্দায় লাগে জ্যোৎস্নার চন্দন।

বাংলাভাষা উচ্চারিত হলে অন্ধ বাউলের একতারা বাজে

উদার গৈরিক মাঠে, খোলা পথে,

উত্তাল নদীর বাঁকে বাঁকে, নদীও নর্তকী হয়...”

কবির কথা আমল দেয় কেইবা এখন? এমন অমোঘ চিত্রকল্প নিয়ে বসে থাকেন গুটিকয়েক মানুষ। তারা কেউ লেখেন বাংলা ভাষায়, কেউ বই প্রকাশ করেন, ছোটো পত্রিকা নিয়ে স্বপ্ন দেখেন ... সত্যি হবে এসব স্বপ্ন কোনও একদিন! বাংলাদেশের কথা আলাদা এখনওবাংলা ভাষা নিয়ে তাদের আবেগের সঙ্গে জড়িত ভাষা আন্দোলন কিন্তু আমাদের দেশে বিপরীত চিত্রএকদিকে মাতৃভাষা দিবস পালনের তাগিদ অন্যদিকে রোজ রোজ ভাষার লাঞ্ছনা। মিশ্র ভাষার ব্যবহার। জোর করে অন্য সংস্কৃতির শব্দ গুঁজে দিয়ে স্মার্ট সাজার বোকা বোকা প্রয়াস। আমি বেশ অনেকগুলো বাঙালি বাচ্চা ছেলেমেয়েকে চিনি যাদের শুধু ইংরেজি আর হিন্দি ভাষা শিখলেই দিব্যি চলে যায়বাংলা ভাষা নিয়ে কোনও মাথাব্যাথাই নেই। অনুতাপ নেই এক বিন্দুও। তাদের বাবা মায়ের বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই, তারা চেষ্টাও করেন না অন্তত বাংলা ভাষার প্রাথমিক জ্ঞানটুকু তাদের সন্তানদের থাকুক। অনেকে হিন্দি শেখার পক্ষে যুক্তি দেন- বেশি নম্বর ওঠে, অনেকে যুক্তি দেন- হিন্দি কাজের ভাষা। যেকোনও ভাষা শিখতে পারাই আনন্দের বিষয়। কিন্তু হাসি পায় যুক্তিগুলো শুনে। আর করুণা হয় সেসব অভিবাবকদের জন্য। স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাষা নিয়ে এইসব ছোটদের কি আগ্রহ! কত কৌতূহল! স্কুলে পড়ানো হয় যত্ন নিয়ে কিন্তু বাচ্চাগুলো মহেশ থেকে ফেলুদা পড়ছে ইংরাজিতে। এসব শুনে কষ্ট হয়। আবোল তাবোল ইংরেজিতে পড়ে সেই মজাটা কি ওরা পাবে? বিদেশের মাটিতে মাতৃভাষার কতটা কদর তারা শুনেছে নিশ্চয় কিন্তু বহু ভাষার এই দেশে চলতা হ্যায় কুছ ভি এই যে আমরা যারা বাংলা ভাষায় লিখছি, কিছুদিন পরে আর আমাদের পাঠক থাকবে না? ছ্যাঁত করে ওঠে বুক কথাটা ভাবলেই। প্রকাশকও গুটিয়ে নেবেন হাত। থাক বাপু। হ্যারি পটার আর হনুমান চালিশা দিয়েই তিনি চালিয়ে নেবেন বইয়ের বাজার, নিজের সংসার, বাকি জীবন বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ভুল বাংলা, অন্য ভাষাকে বাংলা বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা, গুগল ট্রান্সলেশনের বিদঘুটে অনুবাদ, আমরা মেনে নেব এইভাবে! সঠিক ভাষা জানা মানুষদের দিয়ে কি এই অনুবাদের কাজগুলো করানো যায় না? মাতৃভাষা শিখে কিছু মানুষ তো কাজ পেতেন! ফেসবুকে বন্ধুর ছবি দেখে বলব ‘খুব সুন্দর লাগছিস’‘কেন কি’ শব্দের অনায়াস হবে আরো, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানকে বলবে ‘হলদি’, কথার মাঝখানে ‘বাট’ বসবে, হিন্দি স্ল্যাংগুলো এমনভাবে বসবে বাংলা কথায় যাতে সেসব বলে আপনি নজর কেড়ে নিতে পারেন। পিৎজার ওপরে এক্সট্রা চিজের মতো। ইলাস্টিকের মতো বেড়ে যায় তা আর সামলাতে না পারলে লেগে থাকে মুখময়। এমন লেগে থাকাতে লজ্জা নেই। এ যেন জৌলুসের জয়গান! এসব দেখনদারি উদযাপন করা হয়। তাতে দেউলেপনা স্পষ্ট হলে হোক। অথচ যা থাকলে ঐশ্বর্য বাড়ে তা এখন নিঃশেষিত। মাতৃভাষার মান নামুক তাতে কি আসে যায়? কোন কাজে লাগবে এই ভাষা? যেকোনও ভাষা জুড়েই প্রচুর বিদেশি শব্দ থাকে। সেগুলো সত্যিকারের সমৃদ্ধ করে ভাষাকে। কিছু নতুন শব্দ আবিষ্কৃত হয়। মজা লাগে সেসব শুনে। সেগুলো কিন্তু বাংলা ভাষাকে খাটো করেনি। যাদবপুরে পড়ার সময় কিছু শব্দ ও তার উৎপত্তি শুনে মজা লাগত। সবগুলো ভালো না হলেও তাতে সৃষ্টিমূলক ব্যাপার ছিল। ছোটো থেকে কিছু শব্দ ভেঙে গড়ে নতুন শব্দ সন্ধান করতে ভালো লাগত এবং আমার সেসব শব্দ এখনো মনে করিয়ে দেন প্রিয় মানুষেরা। কিন্তু গোঁজামিল শব্দের ব্যবহার বড্ড কানে লাগে। মনে হয় সুন্দর কিছুকে খুবলে নিল।

বিনে পয়সায় সৌজন্য প্রকাশের মাধ্যম হল ভাষা। কোনও  বেসরকারি অফিসের বা হসপিটালের রিসেপসনের দায়িত্বে থাকা মেয়েটি যখন সুন্দর করে কথা বলেন তখন আপনার মনের অনেক উদ্বেগ কেটে যায় কিন্তু সরকারি অফিস কিংবা ব্যঙ্কে যখন একরাশ বিরক্তি নিয়ে আপনার প্রশ্নের দায়সারা উত্তর দেন দায়িত্বে থাকা কর্মীটি, মন বীতশ্রদ্ধ হয়। সংসারে, রাস্তায়, রাজনৈতিক সভায় অপেশাদার সমস্ত ক্ষেত্রেই খারাপ ভাষা, বিচ্ছিরি বলার ধরণ নষ্ট করে সুস্থ স্বাভাবিক পরিমণ্ডল। যে বাচ্চাটি জন্মের পর থেকে কুকথা শুনে আসছে কিংবা শুদ্ধ ভাষার বদলে ‘বিন্দাস’, ‘ধামাকা’, ‘বাওয়াল’, ‘দিমাগ’, ‘বে’, ‘মাল’ এসব শুনে বড়ো হচ্ছে সে এমন গজকচ্ছপ ভাষাকেই বাংলা বলে জানবে। শুদ্ধ ও অশুদ্ধ ভাষার ফারাক তার কাছে থাকবে না। বাংলা ভাষার যে আঞ্চলিক বৈচিত্র, যে ভিন্ন রূপ রস গন্ধ আছে তা নিয়ে কেবল চটকদারি বিনোদন হয়েছে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায় নিইনি আমরা। অথচ এই ভিন্নতাই কিন্তু আগলে রেখেছে বাংলা ভাষাকে। কর্পোরেট সংস্কৃতি শিখিয়েছে ইংরেজি কিংবা ইংরেজি, হিন্দি, বাংলা মিশিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষাই তোমার অর্থাৎ উচ্চ শ্রেণির ভাষা আর যারা নিখাদ বাংলা বলছে অথবা অন্যান্য উপভাষাগুলি যা তোমার শিকড়ে প্রোথিত ছিল তাতে তেমন চটক নেই, তা আসলে নিম্নবর্গের ভাব বিনিময়ের আধার। এখনকার বাংলা ছবি, সিরিয়াল, গানেও অহেতুক অজস্র হিন্দি কিংবা ইংরেজি শব্দ। বাণিজ্যিক বাংলা ছবিতে গানের কথা লেখা হচ্ছে হিন্দিতে। ছবির নামগুলো মনে করে দেখুন, নাম শুনে বোঝা যাবে না কোন ভাষার ছবি- ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘চ্যাম্প’, ‘হিরোগিরি’, ‘বিন্দাস’, ‘লাভ এক্সপ্রেস’, ‘বস’, ‘আওয়ারা’, ‘প্যান্থার’, ‘বচ্চন’, ‘পাওয়ার’, ‘গেম’, ‘জোশ’ ইত্যাদি, ইত্যাদি। একদিন, দুদিন ধরে নয় অনেকদিন ধরেই এমন ধরণের আগ্রাসনের মুখোমুখি বাংলা ভাষা।  

যতই বয়স বাড়ছে ততই বুঝতে পারছি, ভাষাকে ভালোবাসলে সেও ভালোবাসবে। ভাষার ব্যবহার তৈরি করে পরিচিতি। আদল দেয় একটা মানুষকে। শুধুমাত্র গল্প বা কবিতা লেখার ভাষা নয়, রোজকার ভাষা সম্পূর্ণ করে মানুষকে। ভাষার দৈন্য সবার আগে প্রভাব ফেলে মনে। সে প্রতিবাদের ভাষাই হোক, রাজনৈতিক মঞ্চের ভাষণ হোক কিংবা সিরিয়াল সিনেমার সংলাপের বাঁধন। স্থান, কাল পাত্র ভেদে ভাষার সংযম রাখতে জানতে হয়। কিছুদিন আগেই রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর এক রেখে যখন নোংরা শব্দ, গালাগাল বসিয়ে গাইছিল একদল তখন মনে হয়েছিল এও বাকি ছিল! আর মিডিয়া আবিষ্কার করছিল আমাদের দেউলেপনা। যত এইসব সংবাদ ভাইরাল হবে ততই নিজেদের দৈন্য বিজ্ঞাপিত করব আমরা। সুর খুব সুন্দর হলেও খারাপ কথা একটি গানকে কোন জায়গায় নামিয়ে দেয় তার উদাহরণ আমরা পেয়ে গিয়েছি ওই সময়ে এবং আগেও। ভাষার মান আসলে নির্ধারণ করে মানুষের রুচিবোধ, সংস্কৃতি, যাপন ও মূল্যবোধ।