বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

 

কবি মাহমুদ কামালঃ কবিতাভিন্ন এক পথের স্থপতি  


  বাংলাদেশের সাতের দশকের অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি ও অধ্যাপক মাহমুদ কামাল। তাঁর কবিতার সঙ্গে পরিচয় সেই কবে থেকে। শুধু কবিতা নয় তাঁর মননশীল প্রবন্ধও সমৃদ্ধ করেছে বাংলা সাহিত্যের প্রবাহকে।তিনি স্রোতের কবি নন। গতানুগতিকতার বিরুদ্ধে কাব্যচিন্তার নিজস্ব প্রকরণ তৈরি করেছেন রচনা করেছেন আলাদা এক নির্মাণবিশ্ব।গ্রামবাংলার প্রতিদিনের চেনা দৃশ্য যা আমাদের জীবনের সাথে সম্পৃক্ত তারই অন্তর্ভেদী জীবনঘনিষ্ঠ রূপ এবং গ্রামীণ নিসর্গের বিস্তার দেখা যায় তাঁর কবিতার রেখাচিত্রে।নিভৃতমনস্ক কবি তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনালগ্নেই রাজধানীর চিৎকার ও সাড়ম্বর প্রদর্শনী থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। এমনকি প্রতিষ্ঠিত কবি হিসেবে দেশে বিদেশে সম্মানিত হওয়ার পরও কেন্দ্রের প্রতি বিন্দুমাত্র মোহ তাঁকে আচ্ছন্ন করেনি। বরং  নিজের দৃষ্টিকে আরও গভীরভাবে নিবদ্ধ করেছেন বাঙলার নদী মাঠ দিগন্তের দিকে এবং অনুভব করেছেন ‘মানুষই তো প্রকৃত উদ্ভিদ’। ফলে জীবন প্রদায়িনী সেই শেকড়ের কাছে, মাটির কাছে, প্রেম ও প্রকৃতির কাছে নিবেদন করেছেন নিজের সম্পুর্ণ সত্তাকে।     

১৯৫৭ সালের ২৩ অক্টোবর কবির জন্ম বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার আকুরটাকুর এলাকায়। মাহমুদ কামালের বর্ণময় জীবন এবং সাহিত্যের বহুমুখী দিগন্ত  তাঁকে গ্রহণীয় করে তুলেছে অগণন পাঠকের কাছে।বিচিত্র বিষয় এবং জীবনের নানাবিধ পরিসরের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে সৃজনশীলতার ক্ষেত্রকে ব্যপ্ত ও প্রসারিত করেছেন।   

বাংলাদেশে ছয়ের দশকের উত্তাল অস্থির পরিস্থিতি।এই অগ্নিবর্ণ সময়ের উপর দিয়ে হেঁটে এসেছে তাঁর শৈশব-কৈশোরের দিনগুলি।চেতনে অবচেতনে ইতিহাসের এই বাঁক তাঁকে কবিতার এমন এক পথে নিয়ে এসেছে তাঁর অন্তরে বুনে দিয়েছে এমনই এক চিন্তাবীজ  যা সত্তরের দশকে মুক্তির মন্ত্রে কবির জীবন ও ভাবনাকে নিয়ে গেছে ভিন্ন এক পথে।বাস্তবের শ্বাসরোধী জীবন এবং স্বপ্নের উদ্দীপনা কবিতাকে দিয়েছে নতুন মোড়। তবু তাঁর কবিতায় তা সোচ্চার ভাবে ঘোষিত হয়নি। শিল্পময় আবেষ্টনীর ভেতর সেই নিরুচ্চারিত স্বরের স্পর্ধা আমাদের স্তব্ধ ও নির্বাক করে দেয়। 

"একটি শিশির বিন্দু উপুড় হওয়া নদীটাকে প্রশ্ন করে

হে নদীমাতৃক দেশে জননী আমার  

তুমি কি কাঁদছো?

এই প্রশ্নে নদীর কান্নার ধ্বনি

দ্রুত বেড়ে ওঠে

না- কোনও স্রোতধ্বনি নয়, প্রবহমানতা নয়

আনন্দ শীৎকার নয়

নদীটি কাঁদছে খুব পড়ন্ত বিকেলে

তার বুকে জল নেই কেন?’ (উপুড় হওয়া নদী, নির্বাচিত কবিতা )

সমকালীন সমাজ ও প্রেক্ষিত থেকে চিরায়ত দৃশ্যের ভেতর এভাবেই জন্ম নেয় সার্থক কবিতা। টাঙ্গাইলের নদ- নদী,মাটি ও উদ্ভিদ পরিচিত দৃশ্য নিয়ে হাজির হয়।কবিতার অন্তকরণে বেজে ওঠে অন্য এক সুর। বাংলার চিরন্তন নিসর্গ এবং প্রকৃতির চিত্রভাস্কর্যে লেপ্টে থাকে কবির দেশচেতনার গভীরতা।বাংলাদেশের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অবিভাজ্য অংশ ছাড়া একে আর কোন অভিধায় চিহ্নিত করা যেতে পারে! মাহমুদ কামালের কবিতায় নৈসর্গিক প্রাচুর্য, জীবনের সাথে নিসর্গের মেলবন্ধন এবং নদীমাতৃক বাংলার মাতৃত্বের রূপ রঙ গন্ধ চিত্রিত হয়েছে নান্দনিক ভাব সম্ভারে। 

একদিকে নিসর্গ অন্যদিকে সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাত,সময় ও জীবনের সহবাস বহুমাত্রিক উপাদাসমূহে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপতিত, শিল্পের প্রেক্ষাপটে এক শাশ্বত বৈচিত্র্যে সংস্থিতি পেয়েছে। যে-কারণে তাঁর প্রকৃতির কবিতা আমাদের কাছে অভিনব জীবন জাগৃতির কবিতা। 

"অনতিক্রান্ত বৃত্তের ঘুরপাকে

মেধা ও মনন পাশ ফিরে শুয়ে থাকে

সময়ের কাছে নতজানু যত মেধা

পরিপূরকের বিপরীতে হয় নীল

একজীবনের হালখাতা খুলে দেখে দ্বৈরথে শুধু চিৎকার-চেঁচামেচি।"

( সময়ের কাছে নতজানু যত মেধা )

১৯৮৫ সালে আটাশ বছর বয়সে পরকীয়া কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কবির আত্মপ্রকাশ। যাব না তবু যাই ( ২০২০)  তাঁর সাম্প্রতিক প্রকাশিত কবিতার বই। এই ৩৫ বছরের পথ সমৃদ্ধ হয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির উজ্জ্বল দিকচিহ্নে। কবিতার মতো কিছু কথা(১৯৮৭), শব্দেরা কখনো মানতে চায় না ছন্দাছন্দ ( ১৯৯০) স্বপ্নের রাজকন্যা ( ১৯৯৮), বিরামচিহ্ন (১৯৯৯), দ্বিতীয় জীবন ( ২০০১) , বিকেলের সকল চড়ুই ( ২০০৩)  বালক বয়সে (২০০৪), মেঘেরা কোথায় যায় ( ২০০৫) , মুহূর্তের কবিতা( ২০০৬),কাব্যসমগ্র ( ২০০৮), বাকি টুকু অদ্ভুত আধার(  ২০১০,  মুখোশের ভেতরে মুখোশ ( ২০১২), বদলে যায় পথের প্রকৃতি ( ২০১৪) নির্বাচিত কবিতা(২০১৫), আসে যায় মাঝখানে সামান্য সময়( ২০১৭) প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি গল্প এবং উপন্যাসেও তিনি সমানভাবে মেলে দিয়েছেন নিজেকে। গৃহপরিচারিকার গৃহভৃত্য (১৯৯১),এলাচিপুরের সেই লোক (২০১৪) , নির্বাচিত গল্প( ২০১৯) গল্পগ্রন্থের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন কথাভূবন।একমাত্র উপন্যাস স্বপ্নবৃত্তান্ত অথবা জীবনের লক্ষ্য ( ২০০৭) ।প্রবন্ধে চলমান রাজনীতির কথা যেমন এসেছে এসেছে মুক্ত চিন্তার কথা যেমন এসেছে তার সমান্তরালভাবে এসেছে কবিতার নানা বিভঙ্গ ও গদ্যের নানাবিধ স্তর। সম্পাদনা করেছেন অজস্র মূল্যবান গ্রন্থসম্ভার যা বাংলা সাহিত্যের দুনিয়াকে নতুনভাবে চিনতে সাহায্য করেছে।গদ্য ও পদ্যের সম্পন্ন পৃথিবীতে তিনি আপাদমস্তক একজন মগ্ন কবি। রোম্যান্টিক মহার্ঘ মানসিকতার কবি। সৌন্দর্যময়তা বহুকৌণিক বিচ্ছুরণসহ সুসংহত উপলব্ধিতে প্রতিবিম্বিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। চির রহস্যময় প্রেম  আশ্চর্য মহিমা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে শিল্পের প্রচ্ছায়ায়। কখনও  শরীরের ত্রিমাত্রিক অবস্থানের সুগভীর আবহে আবার কখনও বহুমাত্রিক বিস্তারে প্রেম ছড়িয়ে পড়েছে অসীম আধারের দিকে। প্রেমের রহস্য, যন্ত্রণা, আকুলতা, এবং শরীরের  আধারে তার শিল্পময় শিহরণ জীবন্ত রূপ পেয়েছে মাহমুদ কামালের কবিতায়। যৌনতা বাদ দিয়ে প্রেমের অলীক কল্পনায় গা ভাসিয়ে দেননি কবি। প্রেম তাঁর কাছে এসেছে রক্তমাংসের চেহারা নিয়ে, রূপমুগ্ধ দৈহিক সম্মোহন নিয়ে, শারীরিক আশ্লেষের মাধুর্য নিয়ে।  শিল্পোত্তীর্ণ যৌনতা কবির নন্দিত উচ্চারণে এবং হৃদয়ের উষ্ণতায় জারিত হয়ে নিখুঁত রঙ ও রেখায় প্রতিভাত হয়েছে।    

নারী তুমি পাঠ্য হয়ে প্রশংসিত গ্রন্থের মতোই

চলে এলে ঋজু দেহে নিস্তরঙ্গ এই সংসারে

সংসারে এসেই নারী অঞ্চল প্রভাবে তুমি কুসুম ভাঙার গান

গেয়ে উঠে কুমারীর ঘ্রাণটুকু ছড়াতে ছড়াতে

প্রথম পাঠ্যেই প্রিয় অপাঠ্য অদ্রাব্য হলে অকাল কুসুম ( অকাল কুসুম) 

শরীরের আড়াল থেকে উঁকি দেয় শশীকলা ,চাঁদ

এটা কোন ভান নয় প্রাকৃতিক শরীর সংবাদ 

দুই হাত উঁচু করে যখন মুকুর

সবুজাভ নারী সহ চমকে ওঠে যুবতী পুকুর ( যুবতী পুকুর)

 

শাণিত বৃশ্চিক তুমি বৃতি ভেঙে কতদূর নেবে 

বহিরাবরণ খুলে নিতে চাও তাই হোক তবে

বিপরীত বসুমতী দিনরাত করুক বর্ষণ 

এইবার সবকিছু ভুলে গিয়ে বিরোধী বোতাম

খুলে দেবো সুগঠিত ফিটফাট বনানী বদ্বীপ

বিষুবরেখায় যদি বাড়ি ঘর জীবন সংসার

সুচারু ব্যজন তাই বয়ে যাক পাতাল প্রদোষে 

দলিত মথিত করো ফেনায়িত সকল সন্তাপ ( পরকীয়া) 

 

লুকিয়ে রেখেছো মেয়ে সৌন্দর্যের দ্যুতিময় বৃতি

অপরোক্ষ ফ্রেমের ভেতর জীবনের নানা সোনাদানা

সৌন্দর্য প্রেমিক খুশি উঁকি দেয়া চাঁদের প্রচ্ছদে ( মুহুর্তের কবিতা) 

আমি ফিরে পেতে চাই স্বর্ণগ্রাম, কাঁখের কলস

ফিরে পেতে চাই আজ উপর্যুক্ত সকল অতীত

পাখির কাকলিসহ সবুজাভ ফিরে পেতে চাই ( বিকেলের সকল চড়ুই) 

 

আঁধারে ধাঁধার মাঝে 

শিখা টলোমলো 

ফুরিয়ে যেও না মোম

 আরোও কিছু জ্বলো ( মোম/ দ্বিতীয় জীবন)

 

ছাদের রেলিঙে শাড়ি শুয়ে আছে

রেলিঙ কি গর্ভবতী হল ? ( কবিতার মতো কিছু কথা) 

 

যুবতী নদীর টানে বিকেলও হয়ে ওঠে রোদ্দুর যুবক ( কবিতার মতো কিছু কথা )

অনেকের মনে হতে পারে সত্তর দশকের উত্তাল অগ্নিময়তা, সমাজ ও রাজনীতির ঘনীভূত ছায়া থেকে অনেক দূরে সরে গেছে মাহমুদ কামালের কবিতা। প্রেম ভালোবাসা এবং ব্যক্তিগত ভাবালুতার এক নির্জন বৃত্তে আত্মমগ্নতার নিজস্ব দ্বীপে বন্দী হয়ে আছে তার কবিতা। আমি তা বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বাস করি রোমান্টিকতা না থাকলে, ভালোবাসা না থাকলে পৃথিবীকে সুন্দর করে তোলার স্বপ্ন সার্থকতা লাভ করে না। মানুষকে বাদ দিয়ে প্রেম বাদ দিয়ে যে যান্ত্রিক পৃথিবী তার বিকাশ কোন তত্ব দিয়ে, কবিতার কোন ধারা, প্রবাহ বা সময়চেতনা দিয়ে পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব নয়। প্রেমই সেই আশ্চর্য আয়ুধ যা মানুষের অন্তরে রেখে যায় অবিনাশী সময়ের ছায়া। তাই মাহমুদ কামালের কবিতা সমাজ গভীরে সময়োত্তীর্ণ চিহ্ন রেখে যায়। 

 

কখন কিভাবে শোধ করা যায় জীবনের ঋণ 

আলোদাত্রী মা আমার আপনি বলে দিন।

অপত্য স্নেহের মাঝে বেগবান করো যদি তোমার হরিণ 

তখন আমার ছবি ভেসে উঠে শোধ হতে পারে কিছু ঋণ ( মা কে নিয়ে তিনটি কবিতা)

তুমি শেকল পরাতে চাও

কখনো ঈশ্বরের প্ররোচনায় 

কখনো শয়তানের

তুমি কোনও আলোদাত্রী দেবী নও

তুমি নিজেই শেকলে বাঁধা’  (ছায়া অশরীরী/ নির্বাচিত কবিতা)  

শিশুদের কাধে ব্যাগ দিয়ে 

মায়েরা তাদের  নিয়ে 

ইশকুলে যায়

ব্যাগ ভর্তি বই

মাথাভর্তি চুল

গ্রামে না গেলেও তারা চমৎকার গ্রাম এঁকে ফেলে

মায়েরা গর্ব করে বলে দেখো এঁকেছে আমার ছেলে ( মেঘেরা কোথায় যায় ) 

 

আমাদের জীবনের নদীগুলো একদিন ফুঁসে ওঠে

একদিন ঘুম ভাঙে ট্যুরিজম দানবের ডাকে 

নিসর্গ শহর থেকে শুষে নেয় নৈসর্গিক মুখ

আমাদের শহরতলীতে ওরা আজ নতুন দানব

প্রতিদিন খেতে আসে আমাদের লালিত সম্ভ্রম 

আমাদের বাড়িগুলো উঁচু হয়, উঁচু হতে হতে 

আমাদের মেয়েগুলো নিচু হয়ে যায়

বাঙালীর প্রিয় শব্দ কী?

প্রিয়তম? প্রিয়তমা ?

শিশুটি চিৎকার করে বলে ওঠে

মা...  

 এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। তুলে ধরা যায় শুয়রের গল্প বা স্বাধীন পরাধীনতার কবিতার কথা এবং আরও অনেক বিস্তারিত প্রসঙ্গ।এই কবিতাগুলি কি আমাদের সামাজিক সত্তাকে টানটান করে দেয় না ? সমাজের গভীর অবতলে লুকিয়ে থাকা সত্য এবং ক্ষতের সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় না? তাঁর কবিতার নির্মাণশৈলি, প্রেম ,প্রকৃতি,  দ্রোহ ,  স্বপ্ন এবং সম্ভাব্যতার আশ্রয়ভূমি হিসেবে গড়ে তোলা শব্দবিশ্বের সাথে আমার দেখাসাক্ষাত হয়েছে প্রতিনিয়ত । লাইনের পর লাইন পড়তে পড়তে  অবিরাম উত্থান পতন ভাঙন এবং পুণর্গঠন নিয়ে ভেবেছি।শব্দতরঙ্গের ভেতর মাটিসংলগ্ন বাস্তব এবং আত্তীকৃত জিজ্ঞাসার বিকল্প মন্থন তাঁর কবিতার ভেতর এক নব্যস্থাপত্যের সূচনা করেছে। 

মাহমুদ কামালের কথা বাবার কাছে প্রায়ই  শুনতাম। অন্তরঙ্গ মানুষটির সাথে বাবার সখ্যতা দীর্ঘ সময়ের। মুক্তোর মতো অক্ষর নিয়ে দুপাশে মার্জিন রেখে লেখা সেই চিঠিগুলি আজও গোছানো আছে আমাদের বাড়িতে। বাবা কত কথা বলতেন তাঁর কবিতার গভীরতা নিয়ে, অন্তরের বিশালতা নিয়ে। বহুদিনের ইচ্ছে ছিল কবির সাথে দেখা করার। তা পূরণ হয় অবশেষে।  আমার সাথে কবি মাহমুদ কামালের প্রথম পরিচয় হয় হলদিয়া বিশ্ববাংলা কবিতা উৎসবে,  ২০১৭সালে শ্যামলদার( প্রিয় কবি শ্যামলকান্তি দাশ)  মাধ্যমে । প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করে। তাঁর কবিতার মতোই হৃদয়ে বেজে ওঠে এই মুহূর্ত। প্রিয়জনের সাথে দেখা হওয়ার মুহূর্তটি। এরপর তাঁর সাথে বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছে। কলকাতায়  শ্রদ্ধেয় কবি শ্যামলকান্তি দাশের ভারত বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে এবং ২০২০তে আবার হলদিয়ায়। এসব কথা বলার হয়তো দরকার ছিল না। বললাম এইজন্য যে কবিতা আমাদের  জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোন উপাদান নয়।

    কবি মাহমুদ কামাল সরলভঙ্গিমায় গভীর গভীরতর ছবি তুলে ধরেন তাঁর কবিতায় । শব্দের গভীরের  ধরা পড়ে তাঁর পর্যবেক্ষণের নিবিড়তা।অন্তর্বস্তুতে প্রকরণে এবং বিষয় নির্বাচনের দক্ষতায় তাঁর শিল্পীমননের ভিন্নতা প্রকাশিত হয়।নিবিড় সংকেতপূর্ণ চিত্রের মধ্য দিয়ে তৈরি করেন গ্রন্থনার অপূর্ব কারুকাজ।  সরল এবং মর্মস্পর্শী এই কবিতাগুলি  আমাদের চোখে ভিন্ন এক দরজা খুলে দেয়। 

‘যাত্রার প্রস্তুতি শেষে দুঃসংবাদ এলো

স্টেশন পিছনে রেখে ট্রেন চলে গেছে’ ( ট্রেন চলে গেলে/  নির্বাচিত কবিতা) 

পাড় ভাঙতে ভাঙতে কত পথ

নদী হয়ে গেল 

চলতে চলতে কত বন্ধু

বন্ধুর পথের মাঝে ভেঙে দিল প্রীতি ( বদলে যায় পথের প্রকৃতি) 

 

 

একুশ বছর বয়সে মনে হয়েছিল 

সংখ্যাটি বিদ্রোহের

বাহান্ন বছর বয়সে মনে হয়েছিল 

সংখ্যাটি বিপ্লবের

বাষট্টি বছর বয়সে মনে হচ্ছে 

সংখ্যাটি যৌবনের 

কারণ বাষট্টির আগেই বাহান্ন ও একুশ 

আমাকে মন্ত্র শিখিয়েছে ( একুশের মন্ত্র )

পর্বে পর্বে ভাগ করা লৌকিক জীবন

কোন পর্বে আছি তবে নিসর্গ-জমিনে!

প্রতিটি পর্বেই ছিল অবিশুদ্ধ আলো

জিজ্ঞাসাসমূহ থেকে মেলেনি উত্তর ( উড়াল-আড়াল)

সমুদ্রকে কি খণ্ড করা যায়?

পর্বত কিংবা পাহাড়!

এবং আপনাকে – ?

আপনি খণ্ডিত নন, সকলের

সর্বজনীন … ( বঙ্গবন্ধু এই সময়ে)

দূরের জানালা থেকে প্রতীকের মতো

একটি সুতীক্ষ্ণ তীর ছুটে আসে …

বুকের ভেতরে এই চিত্রকল্প-নদী

বয়ে চলে তিরিশ বছর।

আজ এই কার্তিকের আহত বিকেলে

প্রতীকটি ছায়া হয়ে শরীরে লুকায়।( প্রতীকের সেই ছবি )

 আমরা যারা সামান্যতমও লিখি বুকের ভেতরে এই চিত্রকল্পনদীর শব্দ শুনতে পাই। এই নদী  বয়ে চলেছে ভালোবাসার ফল্গুধারা নিয়ে। ক্ষয়িত সময়ের পরিধিতে  অনিশ্চয় জগতের সামনে এসে দাঁড়ালেও শব্দের পাঁজরে আত্মসমর্পণের কোন ইশারা নেই। যাবতীয় জীর্ণতার  প্রতিমূর্তি চূর্ণ  করে কবি এক বিস্ময়কর আঁচ জ্বেলে দিয়েছেন তাঁর কাব্যবীক্ষায়।নানা বিকৃতিতে জীর্ণ রক্তাক্ত জীবনের পাশে প্রেম এবং প্রকৃতির  চিরন্তন্ত্বের কথা ব্যক্ত বারবার  হয়েছে তাঁর কবিতায়। মাটি মানুষ এবং শেকড়কে গভীরভাবে ভালোবেসেছেন। এই রুদ্ধশ্বাস সময়ের ভেতর নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতায়ন খুলে রেখেছেন তিনি স্বদেশ ও সময়ের কাছে।   

আমার নিজস্ব বাড়ি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বাড়ি 

এই বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। ( ব্যাকুল শব্দেরা )