প্রভাত চৌধুরী

 


এবং সইকথার জন্য ধারাবাহিক মুক্তগদ্য (তৃতীয় পর্ব)
 নাইটল্যাম্প এবং রাত্রিকালীন নীরবতা

 প্রথমেই জানিয়ে রাখতে চাইছি এই বাক্যাংশটি, আদতে যা এই লেখার শিরোনাম, সেটি পেলাম কীভাবে। হাত ঘোরালে নাড়ু পাওয়া যায় এই প্রবোধ বাক্যটি বহুকাল প্রবাদ-পুস্তকে লুকিয়ে ছিল, নাড়ু-র প্রত্যাশা না থাকায়। এখনকার শিশুদের নাড়ু-র প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ না থাকায় , বরং আইসক্রিম এবং চকোলেটপ্রীতি তাদের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আমি প্রথমে পেয়েছিলাম একটি নাইটি-কে, তাও আবার বুলগেরিয়ার। তো সেই নাইটি নিয়ে কয়েকছত্র লেখার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। আজ সকালে ছাদে হাঁটাহাঁটির সময় নাইটল্যাম্প শব্দটি উঠে আসে রাতের ট্রেনযাত্রা থেকে। সেই ট্রেনযাত্রা চলতেই থাকে। সেখান থেকে কিশোরবেলা উঁকি দ্যায়। ঘরের সুইসবোর্ডে অনেকগুলো পয়েন্ট থাকত, কেবল - মাত্র আলো-পাখা চালানোর জন্য। তখন ঘরে নাইট-ল্যাম্প  জ্বালানোর  একটা অভ্যাস বা রীতি তৈরি হয়েছিল। আমাদের নাগরিক আভিজাত্যে, আমাদের ব্রিটিশ অনুগামী মানসিকতায় এই নাইটল্যাম্প প্রীতি। আমরা জানতাম সেসময় গ্রামবাংলায় অধিকাংশ ঘরে বিদ্যুৎ ছিল না, হ্যারিকেনও সব বাড়িতে ছিল না, ছিল ছোটো আকারের লম্ফ বা কুপি। তবে আমার গ্রামজীবনে, তথা যাপনে একটি কমিয়ে রাখা হ্যারিকেনকে দেখতে পাচ্ছি। রাত্রে জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে গেলে হ্যারিকেনটির আলো বাড়িয়ে বাইরে যেতাম। বিশেষত সাপের ভয়ে। তখন মূলত দু-টি ভয় খুব সক্রিয় ছিল , একটি ভূতের ভয় , অন্যটি সাপের। আমার অবস্থান থেকে ভূতদের বাসস্থানের দূরত্ব অনেকটা বেশি হওয়ায় আমি ভূতের ভয় থেকে মুক্ত ছিলাম। কিন্তু সাপের ভয়টা জারি থাকত।

 

এরপর ' রাত্রিকালীন নীরবতা ' কোনপথে এল ! প্রথমে এসেছিল ' শরৎকালীন ' শব্দটি , বহুবছর আগে ' শরৎকালীন নৈশ রূপকথা ' নামে একটা কবিতা লিখেছিলাম । সেই রূপকথায় এক নারী ছিল ,  ' ছান্দারের নিরন্নের রানি ' সেই নারী, নেহাৎ-ই আত্মহননের জন্য জলে নেমেছিল, রানিশায়রের জলে । সেই ' শরৎকালীন ' এত বছর পর ফিরে এল

'রাত্রিকালীন' রূপে। হতেও পারে। সবটা দেখতে পাচ্ছি না। কেমন যেন আবছা হয়ে যাচ্ছে। আর যাবতীয় নীরবতা এসে পড়ে ' ঝর্নাতলা ' থেকে। এটা কীভাবে হয়, জানি না। যুক্তির বাইরে এই হওয়া। ঝর্নাতলা তো সর্বদাই শব্দময়, তার নিজস্ব শব্দ - প্রবাহে। তাহলে তো এই নীরবতা-র কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই।

আবার নাইটল্যাম্পের সঙ্গে রাত্রির সম্পর্ক প্রগাঢ়।  কিন্তু নীরবতা ?

এবার নিজের প্রশ্নেই নিজেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছি। দীর্ঘকাল ধরে রাতের নীরবতার কথা বলে চলেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবিরা। সেসব তথ্য সুজিত সরকার এবং রুদ্র কিংশুক ভালো বলতে পারবে  যদিও সবকিছু ভালোভাবে না জেনেও আমি লিখে ফেলি । লেখার অভ্যাসটিকে চালু রাখার জন্য । এতে ফাঁকিগুলো ধরা পড়ে না। এটাও লেখার একটা কৌশল! সকলেই যে এই কৌশল কাজে লাগান , তেমনটাও বলছি না। আমি জানি কম। বুঝিও কম। আবার ইদানীং শুনি-ও কম। অতএব আমাকে সেইসব ঘাটতি পূর্ণ করার জন্য আমাকে বহুবিধ কৌশল কাজে লাগাতে হয়।

 

 যেমন আমি তো রাত্রিকালীন ঝিঁঝির ডাক শুনেছি। আর সেই ' ডাক ' তো নীরবতা-কে সমর্থন করে না , এটাও নতুন করে লেখার বিষয় নয়।

বিষয় হল : নাইটল্যাম্প এবং নীরবতা , দুটি ভিন্ন প্রজাতির শব্দ হলেও , তাদের একই শিরোনামে নিয়ে আসাটাই এই মুক্তগদ্য-র বিশেষত্ব। এই গদ্যটি বন্ধনহীন, নামেই যুক্ত আছে ' মুক্ত ' শব্দটি। আর মুক্ত শব্দটির আভিধানিক অর্থ খোঁজার জন্য অভিধান । অভিধান বলছে :

মুক্ত =  বদ্ধ অবস্থা থেকে ছাড়া পাওয়া। খাঁচা থেকে ছাড়া পাওয়া। গদ্য যে খাঁচায় ছিল , তা প্রমাণ করাটা এখন , এই লেখায় , অত্যাবশ্যক নয়। এই গদ্যটি বন্ধনহীন। শিরোনামে ব্যবহৃত ' এবং ' অব্যয়টি তো যুক্ত করেছে বা বেধে রেখেছে নাইটল্যাম্প এবং নীরবতা-কে। এই অব্যয়টিকে গুরুত্ব না দিয়েই কি বন্ধনহীন লিখেছিলাম! জানি না। অনেক কিছুই জানি না, তবু লিখি। আগেও একবার লিখেছিলাম, আবার লিখলাম। মূলত লেখার অভ্যাস-কে জীবিত রাখার জন্যই যাবতীয় লেখালেখি। এভাবেই লেখাটিকে যদি জীবিত রাখা যায় , তাহলেই

' সার্থকতা '-কে স্পর্শ করা যাবে।