চিরঞ্জীব হালদার



স্মৃতিকথা (২য় পর্ব)


(তিন)


কাছারি পুকুরের ধারে পুলিশ আর মানুষে ছয়লাপ। কোন সোরগোল নেই সবাই কেমন মুখে কুলুপ এঁটে আছে। একটা চাপ চাপ গুমোট কাছারি পুকুরের জলে গুম মেরে আছে।আমড়া পাড়তে যাব বলে বাংলা প্যান্টের পকেটে ঢিলে ভর্তি। হাগু পাছায় লোকে যেমন হাঁটে তেমন আমি চৌধুরীদের সংলগ্ন মাঠ দিয়ে ঢিল পকেটে সেই স্বাদু আমড়া গাছটার দিকে হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি মুহুরী মাস্টার প্রাণপনে উর্দ্ধশ্বাসে ডোবা পুকুরের পাশ দিয়ে আমড়া গাছের দিকে দৌড়ে আসছে। সেরেছে আমার আমড়া চুরির প্ল্যানটা কি মাস্টারমশাই জেনে গেল।ও বাবা দেখি তিনি আমড়া গাছ ছাড়িয়ে সোজা বাদায় লাফ মেরে একেবারে কানুর পল্ট্রীর দিকে পগার পার।তিনি স্কুলের প্রিমিসেসে পরিত্যক্ত জনহীন এক ঘরে সপরিবারে থাকেন।সন্ধ্যের পর সেই দিকে যেতে গেলে বুকটা ছম ছম করতো। দুই ছেলে। মিঠু আর বিকু।যত দূর দেখেছি তার মত নির্বিবাদী,নির্ভেজাল মানুষ সেই সময় তাকে মনে হয়েছে। আমাদের বোধে তিনি কেমন শিক্ষক জানি না তখন।বিকেল হলে কোন সঙ্গ্ ছাড়াই  স্কুলের সামনে ফুটবল মাঠের  এক কোনে তাকে নির্মোহ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতুম।জানি না তিনি বাঙাল না ঘটি। তবে কখনও কখন ও মাছ বাজারে তার দিনাজপুরীয় টানে মাছের দাম জিজ্ঞেস করতে শুনেছি। আমরা জানতাম না হিলি নামে কোন শহর।পরে শুনেছি ইনি যৌবনে অনুশীলন সমিতির সদস্যদের প্রাক স্বাধীনতার আমলে হোস্টেলে ঠাই দেওয়ার কারনে হয় তো চাকরীটা হারিয়েছেন। সবটা অনুমান। ষাটের দশকের শেষে কিভাবে যে এই গাব্বেড়েতে শিক্ষকতায় এসেছিলেন জানিনা। গ্রামের ধনঞ্জয় দাদুর সাথে শুনেছি তার সখ্যতা। শুনেছি তার বোনের সাথে বিবাহের ও কথা হয়েছিল। কিন্তু সবাই তাকে দুষেছিল অমন একচোখো মাস্টারের হাতে বোনকে পাত্রস্থ করার ভাবনায় অনেকের কাছে তেনাকে ছোট হতে হয়েছিল শুনেছি। মুহুরী স্যার সর্ব বিষয়ে পারদর্শী। আর এমন ভাবেই পড়াতেন চাত্র মনোযোগের আধা হলেই সবেতেই ৬০ শতাংশ  নম্বর বাঁধা। অবশ্য আমি তার অনেক অগা ছাত্রের অন্যতম।দশম শ্রেনীতে আমি অসমাপিকা ক্রিয়া আর ভুগোলের কাশ্মীরের ফাঁটা বাঁশে আটকে পড়ে মুহুরী স্যারের দ্বারস্থ হই। একেবারে বিনা পারিশ্রমিকে কেন যে পড়াতে রাজি হয়েছিলেন কে জানে। আগে কখনও তাকে কাউকে পড়াতে দেখিনি। অনেকের সাথে তার বনতো না।টিচার্স রুমে তার উচ্চনাদী গলা ও কখনো শুনেছি মনে পড়ে না। বিরল কেশ দোহার চেয়ারা ধুতির খুঁট ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষকটি যে আসলে শিক্ষকই তা বর্হিবিশ্বে না বেরোলে এই বোধ অধরা থাকতই। তার মুল্যবোধ গুলো অবিস্মরনীয়।আমাদের মত যৌথ চাষী পরিবারে  বছরে  একবারই  লুচি হতো শ্রাবনের বিপদতারিনীর ব্রতে।এই স্যারের বাড়িতে তেনার সাথে ময়দার গরম গরম লুচি খাওয়া আমার স্মৃতির মনিকোঠায় কোটি টাকার স্থান দখল করে আছে। তিনি কি ব্যাকরন কৌমুদী কি লসাগু কি কেশব নাগের হনুমানের অঙ্কে তার অনায়াস ছাত্র বোঝানো। কোন দিন আমি ভারতের ম্যাপ আঁকতে পারিনি ঠিক। তিনি বারবার এঁকে দিচ্ছেন। কোন বকুনি ছাড়া। আমি তার আঁকা দাগে পেন্সিল চালাতে চালাতে ভারত হয়ে উঠছি। প্রতিদিন বিমল হয়ে উঠছি।