(১)
সুতপার
চোখের সামনে ছাদের খোলা দরজাটা দিয়ে যেটুকু দেখা যাচ্ছিল, তা তার চেনা সকালের সাথে মেলে না । আকাশে এতটুকু
মালিন্য নেই - স্কুল, কলেজ, অফিস
যাওয়ার তাড়া নেই - কোনো বাড়িতে রান্না চাপে নি । ছাদে ঘুরঘুর করছে অনেকগুলো
পাখি, পরম নিশ্চিন্তি তাদের চলাফেরায় - যেন কোনো মন্ত্রবলে
হারানো রাজ্যপাট ফিরে পেয়েছে ওরা । এত পাখি-ই বা একসাথে কবে ডাকতে শুনেছে ও !
রাস্তায় গত ২০ দিন ধরে গাড়ি চলাচল বন্ধ ! লকডাউন আবারো ৩ মে পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । কেউ কখনো
ভেবেছিল ? একটা ভাইরাসের আক্রমণে গোটা
পৃথিবী এভাবে থমকে যাবে ! তবু সুতপার মন তার অজান্তেই প্রতিদিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে
আর বলে ওঠে, ‘ভাগ্যিস !’ ওর বিয়ে
হয়েছে মোটে গত ফেব্রুয়ারিতে । আর কটা দিন দেরি হলে কী হতো ! এত ভালো-বাসাবাসি,
চোখে হারানো, পাগল-করা দিন রাতগুলো লকডাউনে
তলিয়ে যেতে পারতো আর কটা দিন দেরি হলে !
"পৃথিবীটা বোধহয় ঘোরা বন্ধ করে দিয়েছে, তাই নয় ?"
- সুপ্রতীক সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলে । সুতপা বলে ওঠে,
"শুভ নববর্ষ !"
"শুভ নববর্ষ"
"তুমি ঘুমোচ্ছিলে বলে ডাকি নি । আর একটু আগে উঠলে একটা চমৎকার ব্যাপার
দেখতে পেতে... !"
আধো
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সুতপার বাঁ হাতের দিকে নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে
সুপ্রতীক জিজ্ঞাসা করে, "কী
বলো তো ?"
সুপ্রতীকের
হাতের ওম সমস্ত অনুভূতি দিয়ে শুষে নিতে নিতে তৃপ্তির সাথে সুতপা বলে, "কয়েকটা হরিণ ! জামসেদপুরে ছোড়দিদের বাড়ির
সামনে ঘুরছিল, ওরা ভিডিও কলিংয়ে এই একটু আগে দেখালো ! তোমার
ঘুম ভাঙাতে চাইনি, তাই... " ইস খুব মিস করলে !"
সুপ্রতীক
দু'পা বাড়িয়ে ছাদে উঠে আসে... ওর
আবির্ভাবে পাখিগুলোর শান্তি বিঘ্নিত হয়, তারা এলোমেলো
ওড়াউড়ি শুরু করে । দুয়েকটা,পাঁচিলে গিয়ে বসে । আকাশে
সূর্যটা দেখে সুপ্রতীকের মনে হয়, যেন ওটাকে কেউ ধরে নতুন
রঙ্ করে দিয়েছে ! নাকি এ তার মনের ভুল ? নতুন বিয়ে হলে,
মনের রঙে সবকিছুই বোধহয় নতুন লাগে !
সুতপা
আদুরে গলায় আবদার করে, "আমাদের
হানিমুনের কী হবে !"
সুপ্রতীক
ঈষৎ দুষ্টুমি টেনে আনে মুখে, বলে "নববর্ষ কাটুক... তারপরই রওনা দেবো ।"
সুতপা
মুখে বলে, ধুর ! এই লকডাউন-টা না ! আর
সময় পেলো না ?" কিন্তু মনে মনে বলে, ভাগ্যিস !
(২)
সবাই
খেতে বসেছিল । মাংস নেহাৎ পরশুই যথেষ্ট কেনা হয়েছিল, তাই নববর্ষে পাঁঠা জুটলো । সুপ্রতীকই বাজারে
গিয়েছিল, তাই একটু অনুযোগের সুর তুলতে সে কসুর করে না,
"আমি আর সাত দিনের আগে বাজারে যাচ্ছি না । বাপরে ! ওইভাবে মুখে
রুমাল ঢেকে, মাস্ক পরে, বাজার হয় !
তাছাড়া লোকজন গায়ের কাছে হেঁচে দিলেও ভয়ে প্রাণ হাতে চলে আসছে । আমি আর যাচ্ছি
না ।"
সুপ্রতীকের
ভাই সুবিমল কথা ঘোরাতে উদ্যোগী হয় । বলে ওঠে,
"বলছি মা, বউদির পাঁঠাটা নির্ঘাৎ আখের
খেতে ঢুকে পড়েছিল ! ওদের তো আর লকডাউন না... !"
পাঁঠার
ঝোলে মিষ্টি কিঞ্চিৎ বেশি হওয়ার দরুণই যে এহেন টিপ্পনি তা বুঝেও সুতপা নতুন
বউয়ের স্বাভাবিক মাধুর্য হারায় না,
ছদ্ম রাগের ভঙ্গি করে মৃদু হাসে । সুবিমলের বেসরকারী চাকরী, অফিস থেকে সপ্তাহে তিনদিন ওয়ার্ক ফ্রম হোমের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু এও জানিয়েছে, মাইনে দেবে হাফ - অর্ধেক কাটবে
। ফলে তুচ্ছ কারণেও সুবিমল রেগে উঠতে পারে - ওকে না চটানোই উচিত । সুতপা জানে…
নতুন বউকে এসব বুঝে চলতে হয় ।
টিভিতে
খবরে বলছিল, "ইতালিতে
মৃত্যু কুড়ি হাজার পাঁচশো ছুঁলো । গোটা পৃথিবীর নিরিখে মৃতের সংখ্যা এক লক্ষ
কুড়ি হাজার ছুঁতে চলেছে । এখনো পাওয়া খবর অনুযায়ী ভারতে মৃতের সংখ্যা তিনশো
চব্বিশ । বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা বিপদের এই শুরু । কারণ এরপর চাকরী হারাতে চলেছে কয়েক
লক্ষ মানুষ ... ।"
রান্নাঘর
থেকে চাটনির বাটিটা আনতে আনতে বিরক্ত সুরে সুপ্রতীকের মা বলেন, "ভালো লাগে না বাপু আজকের দিনে এসব খারাপ খবর
! বন্ধ করো না টিভিটা" - বলতে বলতে আড় চোখে সুবিমলের যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখটা
লক্ষ করেন ।
সুপ্রতীকের
বাবা বছর সাতেক হলো, অবসর
নিয়েছেন । ক্রমশ তাঁর স্বাভাবিক বোধশক্তি হারাচ্ছেন, প্রায়
সব কথাতেই তাঁর অবান্তর মন্তব্যে তা বোঝা যায় । তিনি হঠাৎ বলে ওঠেন, “একটা জোরালো ঝড় হওয়া দরকার – ১৪০ কিলোমিটার মত বেগে
হলেই হবে । এই সব করোনা-ফরোনা উড়ে চলে যাবে ।”
সুবিমলের
মুখে বিদ্রূপ খেলে যায়, বলে “উড়ে কোথায় যাবে ?”
“বাংলাদেশে চলে যাবে … ” – অমায়িক ভঙ্গী-তে এঁটো হাত
উলটে বলেন বাবা ।
“ও ! তাহলেই সব সমস্যার সমাধান ? তা বাংলাদেশ-টা কি
পৃথিবীর বাইরে ?”
এত
সহজ কথাটাও ভাবিয়ে তোলে তাঁকে । ব্যাপারটা বোঝার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে
একগাল হাসেন ।
সুপ্রতীক-সুবিমলের
মা শুধু বলেন, “যত
বুড়ো হচ্ছে, তত ভীমরতি হচ্ছে ….”
সুপ্রতীকের
খাওয়া শেষ হয়েছিল, সে সবে
উঠতে যাবে, এমন সময় বাইরে একটা গোলমাল শুনতে পেল । কুট্টুস
গেটে সামনের দুই পা তুলে চেঁচাচ্ছে আর উঠোনে দুটো অচেনা মেয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে । সুপ্রতীক চশমাটা চোখে তুলে নিতে চিনতে পারে, টুসি আর টুসির মা । ওদের বাড়িতে কাজ করতো বছর চারেক আগে । তখনো
কুট্টুস-কে এবাড়িতে আনা হয় নি । বছর তিনেক হলো, সুবিমল ওকে
এনেছে । টুসি বেশ বড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু টুসির মা যেন
একেবারে ভেঙে পড়েছে ।
সুপ্রতীক
ওদের ভিতরে ডাকে, বারান্দায়
বসায় আর কুকুরটাকে শক্ত করে ধরে রাখে । প্রশ্ন করে বুঝে নেয়, ওরা গতকাল থেকে না খেয়ে আছে, টুসির বাবা রিকশা
চালায় - এখন কাজ বন্ধ । ভয়ে, অবিশ্বাসে টুসির মা-কেও কেউ
ঝি-এর কাজে বহাল করতে চাইছে মা । আর তাই আজ নববর্ষের দিন তারা না খেয়ে আছে ।
সুতপারও
খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু
সে বুঝতে পারে না, তার কর্তব্য । সুপ্রতীকের মা বেরিয়ে এসে
গম্ভীর মুখে বলেন, "ভালো সময় এসেছো বাপু ! ঠিক খাবার
সময় ! ভাগ্যিস কুট্টুসের জন্য একটু মাংস তোলা ছিল... নাহলে কী হতো ?"
শাশুড়ির
নির্দেশে সুতপা দুটো পাত্রে অল্প ভাত আর মাংস এনে ওদের হাতে ধরিয়ে দেয় ।
"মাংস !" বলে গোগ্রাসে গেলে টুসি ।
খেয়ে
নিয়ে, হাত ধুয়ে, একসময়ের কর্মস্থল থেকে উঠোনে নেমে টুসির মা সুপ্রতীককে একগাল হেসে বলে,
"দাদাবাবু একঘর বউ হয়েছে তোমার... ", তারপর সুতপার দিকে চেয়ে দাঁত বার করে বলে, "বউদি,
শুবো নবোবস্সো !"
সুতপা
স্বামীর দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তির শ্বাস ফেলে বলে, "কুট্টুসের জন্য মাংসটুকু তোলা ছিল... তাই,
ভাগ্যিস !"
অভিষেক ঘোষ