সাম্প্রতিক

6/recent/ticker-posts

সজ্জ্বল দত্ত : কবিতা

 




গুচ্ছ কবিতা


"তুই" সিরিজের কবিতা 


 

                          

 

তুই এলে গালগল্পে বেশ কাটে সময় -- 

আমি বকবক করে যাই 

অফিসের সমস্যা বাড়িতে অশান্তি ...  

তোর শুধু মৃদু হাসি, ... হাত তুলে আশ্বাস, 

                           ধৈর্য্য ধরতে বলা। 

ফুল ছুঁয়ে বুঝেশুনে আঙুল ছুঁয়েছি আমি।

আরো কাছে নিয়ে চল, সারাদিন সারারাত 

                           নির্দোষ আড্ডা মারব দুজনে।

 

ফের হাসি ... 

 

দূর হ আপদ কোথাকার -- এক্ষুনি ভাগ শালা 

                           চোখের সামনে থেকে। 

আবার এখানে এলে চাবকে চামড়া তুলে নেব।

ধীরে ধীরে ছোট হয়ে বিন্দুর মত আর 

                                       চোখে পড়ে না।

সামনে তাকালে শুধু অন্ধ আকাশ। 

 

সত্যি আসবে না? ... এবার খারাপ লাগে। 

কাকে বলব গোপন কথা? কার সঙ্গে খুনসুটি? 

                          এমন জড়িয়ে রেখেছিস! 

বলতে বলতে পাগলা, এই তো এসে গেছে। 

অঘোরে ঘুমের মধ্যে সামনে কেবল? 

কী আর করব বল, 

যতক্ষণ জেগে থাকি আমি যে পারিনা এই   

      নতুন পথের ভুল  ব্যস্ত হাওয়ার থেকে

                             নিজেকে সরিয়ে নিতে! 

 

                         

 

আপাততঃ তুইই আমার মাথাব্যথার কারণ। 

কুটকুট কামড়াস হাতে পায়ে বুকে। 

শিরায় রক্তস্রোতে ঝাঁঝালো গন্ধমেশা কী ওষুধ! 

ক্রমশঃ শিথিল আমি অক্টোপাশের শুঁড়ে

            আষ্টেপৃষ্ঠে যেন কোথায় কতদূর ... 

                    গভীর মাটির নীচে 

                               আগুন বিষাক্ত গ্যাস 

                                        জলের মধ্যে দিয়ে ... 

 

আবার কখনো আমি পুরো সজ্ঞানে। 

ফিডিং বটলে তোকে দুধ দিই 

নীচু হয়ে হাত ছুঁয়ে দু'পায়ে প্রণাম করি 

প্রেমিকের মত খেলি শরীরের খেলা। 

আয় রে পাগল, আয়। 

এত করে কাছে পেয়ে এখনও এমন খুঁজি? 

শুধু বল, মাঝেমাঝে কেন? 

পাথরে পাথরে এই চকমকি ঠোকাঠুকি

                                      সর্বসময় নয়? 

 

সত্যি কথাই তবে কান খুলে শুনে রাখ বাপ। 

তোকে যারা দেখে থাকে ফুল মন্ত্র ধুপ ধুনোর মধ্যে

যারা দেখে আলো তাপ শব্দে নিঃশব্দে 

মাথা নীচু, জোড়হাতে তাদের প্রণাম। 

বরং এখন আমি অনায়াসে খুঁজে পাই 

লালচোখ চুল্লুতে উন্মাদ ধর্ষণে 

             প্রোমোটার নেতা আর মাফিয়ার ভিড়ে। 

 

                        

 

আমার মুশকিল এই -- আমি তোকে মানি। 

বন্ধুরা যত বলে 'মুকুল ব্যাকডেটেড', 

আমি তত বেশি খুঁজি, 

যখনই কিছু ঘটে তোর খেলা ধরে নিই।

আমি গঙ্গার উৎসমুখ গ্লেসিয়ারে পা রেখে 

                        বুঝেছি কোথায় তুই। 

পাহাড়ে পাহাড় ঘেরা গর্তের ফাঁক দিয়ে 

              পবিত্র বরফজল আছড়ে নীচের দিকে। 

আবার এ' শহরেই দু'পেয়ে যেগুলো সব 

                          আশেপাশে ঘোরেফেরে 

গলায় রুমাল বাঁধা গালকাটা হাতে ব্লেড! 

এই তো ধন্ধ ভাই! 

ঘুরপাক ... ঘুরপাক প্রবল ঘূর্ণীস্রোত 

একবার এদিকে আবার ছিটকে ওদিকে। 

 

নাকি প্রলয় সামনে ?

আবার নতুন করে তোলপাড় সবকিছু?

ন্যাকাপনা হাসি দেখে পিত্তি জ্বলে যায়। 

এত ডাক, এত এত কাতরকন্ঠে আবেদন, 

তুই দিব্যি মিষ্টি হাসি দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছিস সোনা!

 

আমি যে কী ভুল করি! 

ঝামেলায় পড়ে তবে তোর কাছে আসি।

স্থির লক্ষ্যে তোকে জড়িয়ে রাখব কাছে সর্বক্ষণ?

কাঁদি শুধু ... কেঁদে কেঁদে ভাসাই আপনমনে। 

এখনও দ্বিধায় ... আর তার চেয়েও বড় কথা 

এখন আমার আর সেই মন কই? 

 

                      

 

তোর কথা প্রথম বুঝিয়েছিল বড় জেঠিমা। 

সুন্দর শাড়িপড়া সিঁথিতে লম্বা সিঁদুর 

                 সর্বদা হাসি হাসি মুখ। 

আবার বোঝালো প্রায় 

                 আঠারো বছর পরে কৌশিকদা। 

সুন্দর পাঞ্জাবী কাঁধে ঝোলা চাপদাড়ি 

                  সর্বদা রাগি রাগি মুখ। 

সেদিন তুমুল তর্ক পার্টিঅফিসে। 

কৌশিকদা বলে : "আমরা মানিনা ওই। 

                          মূর্তিই বলো আর শক্তিই বলো --

                          আমরা মানুষ বুঝি, শ্রমিক কৃষক।

                          শোনো, মার্কস বলেছেন ... " 

আপনার সাধ্য কী বড় জেঠিমা! 

কৌশিকদা ওরা এখন আমার গুরু। 

অবশ্য আমি যে কী বুঝি আর কী বুঝি না 

                           সেটাও কঠিন বোঝা। 

তবে এত এত তর্কেও তোর নৌকা 

                           সাগর মহাসাগর ঘুরে 

( এটুকু বুঝেছি ভাই ) ভেসে ভেসে ঠিক ... 

 

ছাপোষা কেরাণী আমি অফিসে ইউনিয়ন

           বাড়িতে সংসার পাড়ায় মোড়লি করে

নৌকায় চড়ার আর যোগ্যতা কই? 

ফলতঃ ওখানে স্থির নৌকা কম্পন নেই 

আমাকে ফেলিস ছুঁড়ে অগাধ জলের মধ্যে 

এগিয়ে চলেছি ভেসে ঢেউয়ে ঢেউয়ে কতদূর! 

এগোয় আকৃতি ...

এগোয় অন্নবস্ত্র ...

এগোয় পার্টিঅফিস ... 

কৌশিকদা ... 

 

                           

 

আমি খুঁজতে গেলেই তুই নিমেষে পগারপার 

           নিজে থেকে এলে তবে ধরা যেতে পারে --

এই মজার খেলাটা আজ 

                          বছর বিশেক ধরে চলতে চলতে 

শেষে খোঁজাখুঁজি একেবারে বাদ। 

 

এই তো হওয়ার কথা। 

 

অথচ আমাকে দ্যাখ, এমন হ্যাংলা লোক 

                                             শুধু খুঁজি। 

সামনে পেছনে ভেতরে ওপরে ডাইনে বাঁয়ে 

দিন নেই রাত নেই যখন যেখানে হোক 

                      যে কোনো কাজের মধ্যে। 

তোর মত বিষমাল এইভাবে ধরা দেবে না, 

                        এ যদি না বুঝি এখনও 

তবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাঁঠা আমি। 

 

স্বর্গ মর্ত্য পাতাল ত্রিভূবন খুঁজে দেখা বাকি রাখিনি।

আকাশ বাতাস মাটি যা যা আছে যতকিছু 

জঙ্গল পাহাড় জল সাদা কালো রঙিন আলো। 

যত আলো সারাদিন গোলাপী কমলা রঙ 

                              লুটেপুটে শুষে নিই 

যত আলো সারারাত শান্ত নরম মোম 

                               সারা গায়ে মেখে নিই 

এইসব যা যা আছে যতকিছু একসঙ্গে 

                               আমি বলি -- 'তুই' 

যা যা বলতে আমিও হতে পারি, 

তুমি হতে পারো, 

হতে পারে গান্ধী, রবিঠাকুর, অযোধ্যা, করসেবা, 

                   এ কে সাতচল্লিশ হাতে লস্কর-ই-তৈবা! 

 

                        

 

এত বড় স্পর্ধা তোর আমাকে নত করে রাখতে চাস? যেখানে ইচ্ছে হয় খোঁজ নিবি -- তোর মত চুনোপুঁটি সময় চাইলে আজ ডেট পাবি পাঁচ মাস বাদে।

 

কিন্তু সমস্যা হল : আদতে হচ্ছে যা -- তুই যে কোথায় কীরকম কিছুই জানি না, হাঁটছি এক পা করে রোজ, তবু তোর দিকে কিছুতেই এগোতে পারি না। বুকজলে গঙ্গায় প্রত্যেকদিন ভোরে জবাকুসুমং সঙ্কাশং করি। ... আকাশের কালো সরে ধীরে ধীরে সাদা, ... আর অবাক দু'চোখে আমি তাকাই নিজের দিকে। কয়েক কদম দূরে লাল এ.সি স্করপিও ঝকঝকে ধোয়ামোছা আমারই অপেক্ষায়। এগোয় ঘড়ির কাঁটা ... মিষ্টি গোলাপী আলো ... দেখতেই থাকি আর দেখতেই থাকি সেই ..., পলক পড়েনা চোখে। জল শুধু আপন গতিতে সদা অন্তহীন স্রোত -- বয়ে বয়ে সামনে এগোয়।

 

কালকের দাদা আমি, যতবড় হরিদাস লাটের বাঁটই হই, তক্ষুনি তোর কাছে সটান লুটিয়ে পড়ি। দু'পায়ে ঠেকাই মাথা। ছুঁয়ে দ্যাখ হাত দিয়ে গরম চামড়া আর বোটকা গন্ধ গায়ে। কী অসীম শান্তি আমি ডুব দিই গঙ্গায়! ধুয়ে যাক সবকিছু নরম স্নিগ্ধস্নান! আমাকে 'আমি'র থেকে উপড়ে বাইরে আন। 

 



সজ্জ্বল দত্ত 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ