অতিথিদের নিত্য যাতায়াত ছাড়াও তাঁর কাছে এসে থাকতেন আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু স্থানীয়রাও। মাঝে মাঝেই হাসপাতাল হয়ে যেত তাঁদের শোয়া-বসার ঘরগুলি। সে চারুদিই হোক বা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা অসুস্থ বা বয়স্ক পরিজন। দেখেছি তাঁর ধৈর্য এবং সেবা। কোনও বিরক্তি বা অনুযোগ কখনও প্রকাশ পায়নি তাঁর কোনও ব্যবহারে। এমনকি এ সময়েও কলেজ ছুটি নিতেও দেখিনি তাঁকে।
নেশা বলতে ছিল, গাছ। বারান্দা ভরে
সবুজ পাতার সমারোহ। ফুলের
থেকেও পাতার অনুরাগী ছিলেন, প্রতিমা। ওই ক্লোরোফিল- সালোক
সংশ্লেষের অক্সিজেনেই ভরে থাকত তাঁর শ্বাসবায়ু। তাই তিনি ছিলেন সতেজ,
কোমল এবং মায়াময়। আর ভালবাসতেন দেশজ শাড়ি---তাঁত, ঢাকাই আর গাদোয়াল। শীতের সময় গায়ে একটা তসর বা উলেন স্কার্ফ।
একমাথা চুলের এলো খোঁপা, ম্যাচিং রুবিয়া ব্লাউজের সঙ্গে
অপূর্ব সব মোলায়েম রঙের শাড়ি আর কপালে একটি লাল টিপ সহ সিথিতে চিরুণী-সিঁদুর। কী
যে পরিশীলিত অথচ উজ্জ্বল সজ্জা।
আর পাঁচজন গড়পড়তা চাকরি করা শিক্ষিত নারীজীবনের সঙ্গে
তাঁর যে খুব মিল ছিল তা নয়। কারণ প্রথিতযশা কবি শঙ্খ ঘোষের ঘরণী তিনি। কিন্তু সেই
আলোর গরিমায় কখনও আচ্ছন্ন হয়নি তাঁর অবস্থান। তাঁকে যেমন দেখেছি তাঁর কর্মক্ষেত্র
বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে বেরিয়ে টুকটাক বাজার সেরে, শ্রীমাণি
মার্কেটের সামনে দিয়ে হেঁটে এসে, বিবেকানন্দ রোডের মোড় থেকে
উল্টোডাঙার বাস ধরতে, তেমনই দেখেছি বিলাসী হোটেলের বড়
পার্টিতে, নিজস্ব ঔজ্জ্বল্য নিয়ে স্বামীর সহচরী
হয়ে বসে থাকতে। দেখেছি মায়া সেন বা সুবিনয় রায়ের একক শুনতে সকালের অনুষ্ঠানেও।
অকাদেমি অফ ফাইন আর্টস, গিরিশ মঞ্চ এবং পরে মধুসূদন মঞ্চের
প্রেক্ষাগৃহে নাটক দেখতে গিয়ে প্রায় সবসময় দেখেছি দু’জনকে। দেখেছি
ছবির প্রদর্শনীতেও; কোন এক কবি সম্মেলনে শঙ্খ ঘোষের কবিতা
গুচ্ছ থেকে যে কবিতা পাঠ করা হচ্ছে তার অনেকগুলিই ‘ইভা’কে নিয়ে লেখা; ইভা তাঁরই ডাক নাম; তখনও দেখেছি আর পাঁচজনের মতো শ্রোতা হয়ে অনায়াসে শুনছেন সেগুলি। বাংলাদেশ
বা এদেশের অন্যান্য রাজ্যে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তাঁর স্বামী যখন বিশেষ আসনে ,
সেখানেও তিনি তাঁর নিত্য সহচরী এবং অনায়াস সাবলীলতায় নির্ভার। ফলে
তাঁর জীবনে আলো এবং ছায়া দুইই পড়েছে সমভাবে এবং তিনি তা ধরে রেখেছেন আমৃত্যু। তাঁর
এই অবস্থান আমাকে বারে বারে আশ্বস্ত করেছে। দিয়েছে আশ্রয়বোধ, স্মরণে রাখার মহিমা।
লেখালেখি শুরু করেছেন আরও পরে। হঠাৎই কোন এক পত্রিকায়
সুভাষ মুখপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁর লেখা গদ্য পড়ে চমকে উঠি। স্মৃতিচারণেও অটুট সেই
সাহিত্যরস যা, একবার পড়লে চিরজীবন মনে থাকে। ধীরে ধীরে
অবগাহন করেছেন লেখায়। বই হয়ে প্রকাশ পেতে শুরু করামাত্র পাঠকের হাতে হাতে ঘুরেছে
সে সব বই; সংস্করণের পর সংস্করণ। জীবনের একেবারে শেষপর্বে
নিজের শোবার ঘরে, জানলার ধারের কোনটিকেই গড়ে নিয়েছিলেন লেখা-
পড়ার স্থান হিসেবে। বেতের চেয়ারের ঠিক মাথার ওপর ঝুলত উজ্জ্বল আলোর একটি শেড।
যেখানে বসে, সামনে তাকালেই সদর অবধি তাঁর সংসার আর বাঁ দিকে
ঘাড় ঘোরালেই, বারান্দায় বেড়ে ওঠা তাঁর সেই সবুজ পাতাবাহারের
টবগুলি।
তাঁদের বসবার ঘরের ভিড় ও সাহিত্যচর্চাকে একটু পাশ
কাটিয়ে, ভেতরের ঘরে তাঁর কাছে গিয়ে বসলেই শান্তি পেয়েছি। বিশদে কথার আদান প্রদান
না করেও নির্দেশে পেয়েছি দিশা এবং মনের জোরে এগিয়ে যাবার পথটুকু। একটা ছোট্ট
মেয়েকে নিয়ে লাট খেতে খেতে আমি যখন দিশেহারা এবং উদ্ভ্রান্ত তখন আশ্রয়ে এসেছে তাঁর
শান্ত দৃষ্টি এবং মমতা মাখানো স্বর---- ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’। শ্রী
শিক্ষায়তন কলেজে পড়াতে এসেই, বাংলা বিভাগের অধ্যাপিকা অমিতা
চক্রবর্তীর কাছে শুনেছি যে, তাঁর আগে ঐ পোস্টে থেকে পড়িয়ে
গেছেন প্রতিমা ঘোষ। কী যে উৎফুল্ল লেগেছে! আমার মতো এক অর্বাচীনের আমন্ত্রণে যখন মেয়ের
বিয়ে এবং নাতিবাবুর অন্নপ্রাশনে এসে দাঁড়িয়েছেন, মনে পড়েছে
তাঁর বলা সেই অমোঘ নির্দেশ …… ‘মেয়েকে আঁকড়ে থেকো, ঝড় গায়ে লাগবে না’। আমার
স্থিতির দিন দেখে গেছেন তিনি ‘উৎসবে—আমন্ত্রণে’।
এ এক পরম সৌভাগ্য যে তাঁর মতো এক নারীর এতো কাছে যাবার
সুযোগ পেয়েছিলাম আমি। বাইরের জগতে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে আমরা পুরস্কার পাই; কিন্তু
সংসারের লড়াইয়ে লাগে আশীর্বাদ --- যা আমি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি পরিপূর্ণভাবে;
কোনদিন তাঁকে কোন উপহার দিয়েছি বলে মনে পড়েনা; কিন্তু উপহারের থেকেও যা বেশি তা হল উৎসর্গ। হ্যাঁ, আমার
প্রথম কবিতার বইটি তাঁকেই উৎসর্গ করে হাতে দিয়ে প্রণাম করেছিলাম। শান্তভাবে হাতে
নিয়ে বলেছিলেন, ‘লেখা থামিও না, কখনও’। অন্যান্যদিনের
মতোই সেদিনও ওইঘরে আর কেউ ছিল না, কিন্তু দুজনেই পরস্পরের দিকে চেয়ে
দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ; সেতু গড়েছিল, সেই
‘কখনও’ শব্দটি।
আজ আর তিনি নেই; ফলে আমারও দায় নেই যে,
এ লেখা কে পড়ল বা পড়ল-না, তা জানার। তবু
লিখলাম এই কারণে যে, তাঁর অবস্থানের মধ্যে দিয়ে নিজেকেও আর
একবার দেখতে পেলাম; খুঁজে
পেলাম আনত বসে থাকার মতো কিছুটা সময়। সেই বারো-তের বছর বয়স থেকে তাঁকে দেখতে দেখতে,
আজ যেন পথচলার আরও এক শুরু হল আমার; আর তা হল
আমার এই সত্তর ছুঁতে চাওয়া বয়সে এসে। আজ আর তিনি শুধুমাত্র কারও স্ত্রী বা মা নন,
একজন মননশীল মানুষ যিনি লেখালেখির মধ্যে দিয়েই তাঁর জীবনের ইতি
টানলেন এবং স্বনামে। তাঁর কাছে ঋণী হয়ে রইল বাংলা সাহিত্যে---- নারী মন এবং নারী
অক্ষর এক অযুত বৈভবে।
(২৯এপ্রিল,২০২৬)

.jpg)


0 মন্তব্যসমূহ