" জয়াবতীর জয়যাত্রা"
এশিয়ার প্রথম মহিলা
ডাক্তার কাদম্বিনী বসু গঙ্গোপাধ্যায়। কোলকাতার মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি
অর্জন করেন এবং আধুনিক চিকিৎসায় ভারতের প্রথম অনুশীলনকারী চিকিৎসক হিসেবে
আত্মপ্রকাশ করেন।
অনেক আগে সুযোগ না থাকলেও এক মহিলা কেমন করে নিজের
জানার আকাঙ্খায় শিখে নিলেন গাছ গাছড়া যা দিয়ে তাঁর পিতৃদেব খল নুড়িতে তৈরি
করতেন মোক্ষম ওষুধ। পিতৃদেবকে
সাহায্য করতে করতে চিনে জেনে নিলেন কোন গাছ পাতার নির্যাস কোন অসুখে প্রয়োগ করতে
হয়।
তৃষ্ণা বসাকের উপন্যাস "জয়াবতীর
জয়যাত্রা" কিছু কথা । লেখিকা এই উপন্যাস লিখেছেন যেন এক রিসার্চ ওয়ার্ক। সেই সময়ের জীবন
যাপন কেমন ছিল? বালিকা অনূড়া থাকলে কত বিপদ। গাঁ গঞ্জ সেই
পরিবার কে করে দেবে এক ঘরে।
এই উপন্যাস অন্য কথা বলে।
পেপার ব্যাক বই,
সুন্দর ভূমিকা। ভূমিকায় নিজের পরিবার পরিচিতি। তৃষ্ণা এক নৈয়ায়িক পরিবারের উত্তরসূরী।
ভূমিকা সত্যিই অনবদ্য।
ন্যায় অন্যায় বোধ যার আছে সে অনায়াসে প্রতিবাদ
করে নিজের পথ চলাকে মসৃণ করে ।
উপন্যাস শুরু হচ্ছে এক অনূড়া কন্যার পিতৃদেবের
সঙ্গে কথোপকথনে।
'ডুরে শাড়ি কোমরে জড়ানো, এক ঢাল চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে, ছোট্ট কপালে
বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে যেন মুকুতা; খলনূড়ির ওপর ঝুঁকে
রয়েছে সমস্ত শরীর, জগৎ সংসারের কোনোদিকেই তার হুঁশ নেই। কালীগতি এত কাছে থেকে " জয়া, জয়া মা , তা শুনতেই পেল না সে। কালীগতি এবার ওর
মাথায় হাত দিয়ে ডাকলেন "জয়া জয়া" জয়া চমকে তাকাল । তার মুখে ফুটে
উঠল অপূর্ব এক হাসি ।
" আপনি ডাকছেন পিতাঠাকুর "?
জয়া যখন জানতে পারল , ছোট ভাই কে সামলাতে হবে , জয়া নিজের
কথা স্পষ্ট করে বলল ঘুম থেকে উঠলে শিশু মাকেই খোঁজে।
পিতা কালীগতি তর্করত্ন বোলসিদ্ধি গ্রামের বা আশপাশের
দশটা গ্রামের কেউ মুখের ওপর কথা বলে না সেখানে জয়াবতীর অনায়াস সহজ উত্তর । কেন
জয়াবতীকে গৌরীদান করা হয়নি তা নিয়ে ঘরেই মৃদু গঞ্জনা সইতে হয়।
জয়াবতী নিজের সর্তে কাজ করে। জয়াবতী এখন কালী তৈরিতে ব্যস্ত। তৃষ্ণা
সুন্দর ছড়ায় বলেছেন
" তিল ত্রিফলা শিমুলছালা
ছাগদুগ্ধে করি মেলা
লৌহ পাত্রে লোহায় ঘসি
ছেঁড়ে পত্র না ছেড়ে মসী।
কেন ছড়া তৈরি হল! কারণ যারা নিরক্ষর তারাও কালী
তৈরি করতে পারবে।
এই বংশেই দুই পুরুষ আগে দুই কন্যা লক্ষ্মী সরস্বতীর
কাশী থেকে আগত মহা পন্ডিতকে তর্ক যুদ্ধে হারিয়েছিলেন। ফল স্বরূপ পিতা দেবগতি দুই কন্যা কে বাড়ি থেকে
বিতাড়িত করেছিলেন। সেই দুই
কন্যা কাশি তে টোল খুলেছিলেন।
কালীগতির মনে হল জয়াবতীর মত মেয়েদের একটু বিদ্যে
থাকলে হয়তো চরক সুশ্রুত আর্যভট্টদের মতন বিজ্ঞানী হতে পারত।
কালীগতির কাছে একটি চিত্র সমেত ভিষক পুঁথি আছে।
বিভিন্ন ওষুধ হাতের হাতের
কাছের উপকরণ দিয়ে তৈরি
হবে এবং কোন অসুখে প্রয়োগ হবে। জয়াবতী নানান কাজের ফাঁকে সেই পুঁথি ঘাঁটাঘাঁটি
করে।
জয়াবতীর বন্ধু পুণ্যি সে সদ্য বিধবা তার সঙ্গে যখন
তখন যেখানে ইচ্ছে যায়। পুণ্যি তার কাকার কাছে সংস্কৃত শিখেছে।
একদিন জয়াবতী বাড়িতে এসে দেখল বাবা মা জ্বরে
বেহুস। শুধু ছোট ভাই খেলা
করছে। এরপর কেমন করে উপস্থিত বুদ্ধির জোরে সবাইকে সুস্থ করে তুলল শুধু মাত্র সেই
ভিষক পুঁথির ছবি আর পুণ্যির সাহায্যে তা অবাক করে।
কালীগতি মেয়েকে পাঠালেন তিনটে গ্রাম দূরে দীননাথ
সেনমশাইয়ের কাছে চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য। পুণ্যির পুঁথিগত বিদ্যা আছে
জয়াবতীর ব্যবহারিক জ্ঞান অনেক বেশি।
চিকিৎসা বিদ্যা শেখার সঙ্গে নানারকম শিক্ষা দুই সখি
শিখতে লাগল। ঘোড়ায়
চড়া শিখতেই হলো ভিন রাজ্যে চিকিৎসা করার জন্য।
কতদিন আগের কথা তবুও জয়াবতী আর বিধবা মেয়ে পুণ্যি বাড়ির থেকে বেরিয়ে অনেক দূরের গ্রামে গিয়ে
চিকিৎসা বিদ্যা শিখল । জয়াবতী কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতি পদক্ষেপে প্রতিবাদ করত।
সেই সময় সতীদাহ প্রথা ছিল, মেয়েদের ডাকাত দল ধরে নিয়ে
যেত, সব কিছুর বিরুদ্ধেই রুখে দাঁড়িয়েছে। দুই নারীকে উদ্ধার করেছে হিংস্র সমাজ ব্যবস্থার
আস্ফালন থেকে। পেরজাপতি আর উমাশশীকে।
উদ্ধার হওয়া দুই নারী মূর্খ নয়। উমাশশী তাৎক্ষণিক
মুখে মুখে তৈরি করে কবিতা।
এই দিন যাপনের মধ্যেই তারা পিতৃগৃহে এলো বোলসিদ্ধি
গ্রামে।
জয়াবতীর খুব ইচ্ছে ছিল একবার পুরী শ্রীক্ষেত্র যাবে। জয়াবতীর সেই ইচ্ছে কেমন করে পূর্ণ হল , আর চিকিৎসক হিসেবে কেমন করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল তার আখ্যান এই "
জয়াবতীর জয়যাত্রা।"
বইটি পড়তে পড়তে আমার আবার খুব ইচ্ছে করছিল আবার
আমি পড়াশোনা শুরু করি।
খুব ভাল উপন্যাস। সবার পড়া উচিত।
বেশ কিছুদিন ধরে রেখে রেখে
পড়লাম সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায় এর উপন্যাস "হেমনলিনীর দলিল"। ধীরে ধীরে
পড়লাম যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়।
কোন সময়ের
দলিল পরিষ্কার পেছনের কভারে লেখা আছে।
মেয়েদের
অন্দর মহল আর সেই অন্দর মহল থেকে ছিটেফোঁটা বাইরের মহল যতটুকু দেখা যায় একটি
মেয়ের নিরলস যাপন তাই নথিভুক্ত এই উপন্যাসে।
সঙ্গীতা বইটি
তাঁর মাকে উৎসর্গ করেছেন।
প্রথম পাতায়
বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ্য কর্তা কোলকাতা থেকে ফিরেই হাঁকডাক শুরু করেছেন কারণ তিনি
শুনে এসেছেন এক ভিনদেশীর দেশে জল একদম পাওয়া যায় না , আর কোলকাতার রাস্তায় কলের জল অনবরত পড়ে যাচ্ছে
। তার দেশে চওড়া পুকুরের মত কেটে ধাপি তৈরি করে ধাপে ধাপে নেমে জল তুলতে হয়।
সঙ্গে সঙ্গেই দীননাথ শিখলেন তাঁদের বাড়িতেও অমন সিঁড়ি দেওয়া পুকুর থাকলে বেশ
হয়।
এই যে জলের
কথা হলো দীননাথ খুব চেঁচিয়ে দুই ভাইকে বললেন। দীননাথের কথা ভেতর বাড়িতেও
পৌঁছলো।
" কর্তার
গলাটি তো বাজখাঁই। তাঁর গিন্নি, বাড়ির বড় বউ ক্ষিরোদা বলে
চাকর মুনিষ খাটিয়ে কর্তার গলা যেন ষাঁড়ের মতো হয়ে যাচ্ছে। মেজ বউ সারদার মাথায়
দুষ্টুবুদ্ধি খুব। ক্ষিরোদার দিকে তাকিয়ে বলে বড়দাকে ক-দিন খুব করে দই খাইয়ে
গলার ধারটা কমিয়ে দাও দিদি। ছোট জা রাধারাণী ময়দায় জল ঢেলে ফেলেছে একগাদা। ভয়ে
ভয়ে দুই জায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, " ও দিদি! জল বেশি
পড়ে গেল যে!"
বড় দুই জা
খিলখিল করে হাসে। ক্ষিরোদা বলে, " নে আজ দেখি জলের বন্যা বইছে। বাইরে বড়কর্তা আর ঘরে ছোটগিন্নি পুকুর কাটতে
লেগেছে আজ ।"
এই যে অন্দর
মহল আর বাইরের বৈঠক খানা কেমন মিলমিশে গেল। একান্নবর্তী সংসার ছোট টুকরো কথায়
কেমন হৈ হৈ করে নানান কান্ড কারখানায় মজে থাকে সঙ্গীতা তার লেখায় ফুটিয়ে
তুলেছে।
বইটি পড়তে
পড়তে মনে হলো লেখিকা যেন প্রতিটি চরিত্র খুব কাছ থেকে দেখেছেন ।
অনবদ্য
উপন্যাস।
লেখায় আঁতুর
ঘরের কথা আসে।তখনকার দিনে আঁতুর ঘরের নিপুণ ছবি। আঁতুর ঘরের বর্ণনায় গলার কাছে
কষ্টের দানা বাঁধে। সেই কষ্ট কেমন অন্ধকার আচ্ছন্ন। মাটি আর খড় এই ছিল আঁতুর ঘরের
নমুনা। আঁতুর ঘরে একটা ধাপি করার আর্জি কত কঠিন ছিল।
' ক্ষিরোদা
এই বাড়িতে এসেছে সেই সাত বছর বয়সে। ওই কালকুঠুরির মতো ঘরটায় ঢুকতে শুরু করেছে
বারো থেকে। তেরোবার ঢুকেছে এখনও অবধি। তার মধ্যে ছ-টিকে খুইয়েছেও ওই ঘরেই। সে
বিলক্ষণ জানে ও ঘরের কষ্ট। সারদাও ঢুকেছে তিনবার প্রথমটি। প্রথমটি ওঘর থেকে
বেরোয়নি। পরের দুটি, নবনী আর সোমনাথ অবশ্য শত্তুরের মুখে
ছাই দিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে। তবে এ দুটি হয়েছিল বোশেখ আর ভাদ্রয়। সে যে কী ভ্যাপসা
গরম, তায় চান নেই, ধোয়া পাকলা মানা।
নিজের গায়ের গন্ধে সারদা ওয়াক তুলতো তখন।
উপন্যাসটি
ছোট বড় চালচিত্র যেন। জন্ম বিয়ে মৃত্যু যা কিছু অমোঘ তাই দিয়ে নিপুণ আঁকা। কোনও
পরিবারই উচ্চবিত্ত না। তবে সচ্ছল। এক পরিবার থেকে মেয়েরা বউ হয়ে আসে আর এক
পরিবার থেকে মেয়েরা বউ হয়ে অন্য পরিবারে মিশে যায়। সেই যাওয়া আসা যে কী যাওয়া
আসা বলার নয়। বছরের পর বছর বাবা মা ভাই বোন কারোর সঙ্গে দেখা সাক্ষাত নেই। পড়া
শোনাও মেয়েরা জানেনা যে চিঠি আদান প্রদান হবে। এই খানেই লেখিকা এমন এক স্বপ্ন
বুনলেন, কেমন করে একটু একটু করে বাড়ির
মেয়েরা নিজেদের ইচ্ছে আর একাগ্রতা দিয়ে স্কুল পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ করে নিল। এ
তো একদিনে কিছু হয়নি অনেক সময় লেগেছে ঘর থেকে রাজপথ যেতে। এই দীর্ঘ সময়ের ঘটনা
প্রবাহ রাধারাণী আর হেমনলিনীর যাপন কেমন তা এই উপন্যাসের প্রাণ।
সুন্দর ভাষায় উপন্যাসের পরিকাঠামো অটুট। লাইন বাই লাইন লিখে দিতে ইচ্ছে করে।
জন্ম অনঙ্গতে
আর বিয়ের পর হেমনলিনীর সংসার লাতেহার। সেখানে এক ইংরেজ মহিলার সঙ্গে বন্ধুত্ব, নাম ইভা । পরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইভার সঙ্গে
দূরত্ব । যোগাযোগ চিঠির মাধ্যম। তবুও সেই যোগাযোগও ক্ষীণ হলো। হেমনলিনীর বয়স তার
স্বামী তার সন্তান সব নিয়ে এক অসাধারণ বুনোট এই উপন্যাস । যা লেখিকার কাছে এক
প্রজন্মের দলিল অন্য প্রজন্মের জন্য। এই দলিল পরের প্রজন্মের জন্য এক সম্পত্তির
হিসাব।
দীপা
চ্যাটার্জী





0 মন্তব্যসমূহ