তন্ময় ধর


যে যায় জতুগৃহে

    

এখানে ঈশ্বরের আবাসভূমি বড় চঞ্চল। স্থূল দ্রব্যময়ী এই পৃথিবীর শীত-উষ্ণতায় সাড়া দিয়ে আবাসভূমি বদল করেন দেবতারা। মানুষের পাপ শরীরে ধারণ করে হিমালয়ের প্রত্যন্তে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে লুকিয়ে থাকেন ঈশ্বর। ঈশ্বরের সন্তানরা সম্মুখীন হয় গৃহদাহের। জতুগৃহের সেই গল্প আমরা জানি। সে গল্প শুনতে শুনতে পাহাড়ী পথে আমাদের গাড়ি চলতে থাকে। হাওয়ায় হিমের পরশ বাড়তে থাকে। কেম্পটি জলপ্রপাত পেরিয়ে, যমুনার সেতু পেরিয়ে শীতার্ত চির-পাইন-দেওদারের ফিসফাস শুনতে শুনতে পৃথিবীর সমস্ত সংকেত থেকে কখন যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম, নিজেই বুঝি নি। এক অলক্ষ্য কালের যাত্রায় সামনে এসে দাঁড়াল অতিকায় প্রস্তরের স্তূপ, অতিচঞ্চল স্রোতস্বিনীর জলধ্বনি আর দেবশিশুদের মুখ। গাড়ির ড্রাইভার ব্যাকগ্রাউন্ডে পাহাড়ী গান চালিয়ে দিয়েছেন। সে গান বলছে ‘পথের প্রান্তে কারো চোখে জেগে আছে তোমার অপেক্ষা’।


ব্রেক কষেন ড্রাইভার ‘এই হোটেলে রাজ কাপুর অমুক সিনেমার শ্যুটিংয়ের সময় খাবার খেয়েছিলেন’। আমরা ঢুকি সেই রেস্টুরেন্টে। অনন্ত রিসাইকেল হওয়া চায়ের পাতা বহু যত্নসহকারে অষ্টসিদ্ধ করে এবং মাত্রাতিরিক্ত চিনি মিশিয়ে আমাদের মুখের সামনে ধরে রাজ কাপুরের ভঙ্গিতে হাসতে থাকেন রেস্টুরেন্টের কর্তা। সঙ্গে পেল্লায় সাইজের আলুপরোটা। আমরা তাই চিবোতে চিবোতে গান ধরি ‘ কিসি কি মুস্কুরাহটোঁ পে হো নিসার/ কিসি কা দর্দ মিল সকেঁ তো লে উধার/ খানা ইসি কা নাম হ্যাঁয়...’

খেয়েদেয়ে তমসার জলে হাত ধুয়ে গাড়িতে উঠে পড়ি। ভাঙাচোরা রাস্তায় দুলতে দুলতে গাড়ি এগিয়ে চলে। ড্রাইভার তার জীবনের গল্প বলে চলেন। পাথর ভাঙা কষ্টসহিষ্ণু সেই গল্পে কখন যেন ঢুকে পড়ে অলৌকিকতা। অন্ধকার পাহাড়ী মেঘ এসে ভরদুপুর বেলা পরিবেশকে রোমাঞ্চকর করে তোলে।



দেখতে দেখতে আমরা শান্ত লোহার সেতুটা পেরিয়ে ঢুকে পড়েছি লাখামন্ডল জনপদে। ঢোকার মুখেই পান্ডব গুহা। হ্যাঁ, বিদুরের তৈরি এই পথেই মহানিষ্ক্রমণ ঘটেছিল পান্ডবদের। ভেতরে আধা-অন্ধকার সুড়ঙ্গে ঢুকলাম। এখন কৃত্রিম আলো জ্বেলে আলোকিত করা হয়েছে। তার দেওয়ালে দেওয়ালে যেন জ্বলন্ত লাক্ষার চিহ্ন। তার জন্য ভূতাত্ত্বিকেরা যমুনা নদীর জলপ্রবাহ আর শিলাস্তরে ভূ-রাসায়নিক ক্রিয়াকে দায়ী করবেন। অচতুর্বদন ব্রহ্মা, অপরদ্বিবাহু হরি এবং অভাললোচন শিব স্বয়ং ব্যাসদেবের মতো শ্মশ্রুময় এক সন্ন্যাসী আমাদের বলে চলেছেন মহাভারতের কাহিনি। বারণাবতের কুয়াশামাখা অন্ধকার গুহায় এসে দাঁড়িয়েছেন পুরোচন। দুর্যোধন তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কিভাবে জতুগৃহ নির্মাণ করে তার মধ্যে পান্ডবদের পুড়িয়ে মারতে হবে। পান্ডবরা যথাসময়ে এসে হাজির হলেন বারণাবতে। সঙ্গে মাতা কুন্তী। পুরোচনের আতিথ্যে থেকে ব্রাহ্মণসেবায় ব্যস্ত তাঁরা। ওদিকে বিদূর দূত পাঠিয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে পুরোচন লাক্ষাগৃহে আগুন দেবেন। সে ইঙ্গিত শুনে বিদূরের দেখানো পথে যতুগৃহ থেকে পঞ্চপান্ডব ও মাতা কুন্তীকে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেলেন ভীম। যাওয়ার আগে আগুন লাগিয়ে গেলেন জতুগৃহে। সে আগুনে পুড়ে মরল পুরোচন ও নিষাদরমণীর পাঁচ ছেলে। সবাই ভাবল, পান্ডবেরা পুড়ে মরেছে। ধৃতরাষ্ট্র হা-হুতাশ করতে লাগলেন। পান্ডবেরা ততক্ষণে যমুনা উপত্যকা ছেড়ে গঙ্গার তীরে পৌঁছে গিয়েছেন।


আমরা গল্প শুনতে শুনতে পৌঁছে গিয়েছি লাখামন্ডলের প্রধান শিবমন্দিরে। উত্তরভারতীয় নাগর শ্রেণীর স্থাপত্যে তৈরি দ্বাদশ শতকের মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহ জুড়ে অসংখ্য প্রস্তরমূর্তি। শিবপার্বতীর জীবনের বিভিন্ন কাহিনি। বাইরে মন্দির চত্বর জুড়ে অসংখ্য শিবলিঙ্গ। প্রধান পুরোহিত এগিয়ে এসে মন্দির তৈরির কাহিনি বলতে থাকেন। মন্দির প্রাঙ্গণের লক্ষ শিবলিঙ্গের কাহিনি বলতে থাকেন। ‘ইউটিউবে আমি এই মন্দির নিয়ে একটা ভিডিও করেছি। অবশ্যই সময় করে দেখবেন। মতামত দেবেন’ পুরোহিত হাসেন। নিয়ে চলেন মন্দিরের ডানপাশের ভগ্নস্তূপে ‘এখানেই ছিল জতুগৃহের প্রবেশপথ। আর এই জনপদের প্রবেশদ্বারে যে গুহাগুলো দেখেছেন, সেগুলো নিষ্ক্রমণের পথ। এই যে দুই দ্বারপাল, এঁরা বৈকুন্ঠের দুই দ্বাররক্ষক- জয় এবং বিজয়। পরে সনৎকুমারের অভিশাপে এরা সত্যযুগে হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু, ত্রেতাযুগে রাবণ ও কুম্ভকর্ণ, দ্বাপরে শিশুপাল ও দন্তবক্র হয়ে জন্ম নেন। বর্তমান যুগে এরা মানব ও দানব’ কথা বলতে বলতে আমরা চলে আসি স্ফটকস্বচ্ছ এক শিবলিঙ্গের সামনে। গ্রাফাইটের তৈরি এই শিবলিঙ্গটির সামনে দাঁড়ালে দর্শক নিজের ঝকঝকে প্রতিবিম্ব দেখতে পান।


এদিকে হঠাৎই মন্দির চত্বরে কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছেন একদল মানুষ। রংবেরং-এর পোশাক আর ফুল অপরূপ তাদের সাজ। তাদের বিবাহ অনুষ্ঠান নাকি হবে মন্দির চত্বরে। ক্ষণিকের মধ্যে রংবাহারী শামিয়ানায় আর ফুলমালায় সেজে উঠল মন্দির প্রাঙ্গণ। কাড়া-নাকাড়া জাতীয় বিচিত্র সব বাদ্যযন্ত্রে পাহাড়ী সুরের স্পন্দনে মোহময় এক পরিবেশ রচিত হয়ে গেল। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আর মহাকালের সরণী বেয়ে যুগযুগান্ত ধরে আসতে লাগল হুণ, জৈনসারী, তিব্বতী, গাড়ওয়ালী মানুষের স্রোত। আমরাই যেন পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। আর এক অনন্ত জীবনীশক্তির মহাতরঙ্গ, এক সুখ ও আনন্দের মহাতরঙ্গ যেন এই পার্থিব অস্তিত্ব ছাপিয়ে উঠে যাচ্ছে ঊর্ধ্বে, অনন্ত আকাশে।

.


 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন