“ঐ রে আসছে!” তানিয়ার
কথায় চোখ তুলে তাকিয়েই রি রি করে গা জ্বলে উঠল সুকন্যার। “আপদ একটা” মনে মনে বলল
সে। এই এক অশান্তি! কলেজে নতুন ভরতি হয়ে খুব ভালো লাগছে ওর। গার্লস স্কুলের
নিয়ন্ত্রিত শৃঙ্খলামুক্ত হয়ে কো এড কলেজে এসে বেশ গা ভাসিয়ে বেড়াচ্ছিল। তার মধ্যে
তালভঙ্গ। অখাদ্যটার নাম জয়জিৎ। এই বয়সে বিপরীত লিঙ্গের
প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিক কিন্তু, এটাকে দেখলেই মেয়েদের মনে তীব্র বিকর্ষণ জাগে।
বাজ পড়া তালগাছের মত
চেহারা, কানে দুল, হাতে বালা, হানি সিং কাট চুলে যা দেখায় না—সুকন্যার মাঝে মাঝে
মনে হয় নাক বিঁধিয়ে একটা নথ পরলেও পারে। নাঃ চেহারা নিয়ে কিছু বক্তব্য নেই, ওটা তো
কারুর হাতে নয়, কিন্তু সাজগোজ, পোষাকআশাক,
চলাফেরা, কথাবার্তা ভয়ানক খারাপ লাগা তৈরি করে মনে। মেয়ে দেখলেই হল, জল চাইতে চলে
আসে। এর মধ্যেই একদিন সুকন্যা করিডোরে দাঁড়িয়ে বোতল থেকে সদ্য ভরা ঠান্ডা জল
খাচ্ছিল। শয়তানটা এসেই অসভ্যের মত বলল, “শুধু নিজে খেলেই হবে, আমারও তো তেষ্টা
পায়। জল দে”। ওই সুযোগে গায়ের উপর এসে পড়ে আর কি।
সব ভালো—কলেজ, ক্লাস,
পড়াশোনা, ম্যাডাম, স্যার, দাদা দিদিরা, ক্যান্টিন—কেবল ওই চাতকটা ছাড়া। সুকন্যা
মনে মনে ওই নামটাই দিয়েছে, তবে এখনও কলেজে কাউকে বলে নি। কি দরকার বাবা! ইউনিয়নের
চাঁই বলে কথা। মা বলে দিয়েছেন ইউনিয়নের ছেলেদের ব্যাপারে সাবধান থাকতে।
একা সুকন্যা নয়, সারা
কলেজের মেয়েদের কাছে আতঙ্ক চাতক। সুকন্যার একেক সময় খুব আপশোষ হয় কেন যে বাবার
কথামত ক্যারাটের ক্লাসে ভর্তি হল না! সেলফ ডিফেন্স খুবই দরকারী- এখন একা পথ চলতে
গিয়ে প্রায়ই অনুভব করে সে।
ইংরাজী বিভাগের অমৃতা
ডাকসাইটে সুন্দরী। চাতক একদিন সোজা এসে তার কাঁধে হাত রেখে জল চাইল। অপমানে, ভয়ে
অমৃতা সেদিন কেঁদে ফেলেছিল। এটা যে কি অসভ্যতা, যারা পরিস্থিতিটার সম্মুখীন হয়েছে
তারাই বোঝে। অমৃতা কলেজে আসা প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। ইন্টারন্যাল টেস্টের সময় ওর
বিবর্ণ শুকনো মুখ দেখে সবারই খুব কষ্ট হয়েছে। রাগে সুকন্যার হাত নিশপিশ করে। কিছুই
কি করার নেই?
কলেজের সোশ্যাল এগিয়ে এল।
সুকন্যা ছোটবেলা থেকে খেয়াল শিখছে খুব নামী গুরুর কাছে। সোশ্যালে গান গাইবার জন্যে
তার ডাক পড়েছে। রিহার্সাল রুমেও হতচ্ছারাটার উৎপাত শুরু হল। গান গাইছে অন্যরা, গলা
শুকাচ্ছে চাতকের। যেমন রাক্ষসের মত সাজ, তেমনি রাক্ষুসে তেষ্টা। সুকন্যা ভাবে
একসঙ্গে প্রতিবাদ করা কি খুবই অসম্ভব?
সোশ্যালের অনুষ্ঠান বেশ
ভাল হয়েছে। বিশেষ করে সুকন্যা খুব খুশি গানটা গেয়ে।বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে অডিটোরিয়াম থেকে বেড়িয়ে আসছে;এবার বাড়ি ফেরার
পালা। হঠাৎ পিছন থেকে “বেগম আখতার, একটু জল খাইয়ে যাও”! “চাতক”!
সুকন্যার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। ব্যাগ থেকে জলের বোতলটা বের করে মুখটা খুলেই সমস্ত
জল ছুঁড়ে দিল চাতকের মুখে। কেবল এক মিনিটের নীরবতা। তারপরেই সব কটা মেয়ে নিজেদের বোতলের জল ছুঁড়ে
দিতে লাগল চাতকের দিকে। আশপাশ থেকে ছুটে এল অনেকেই। ইউনিয়ন রুম থেকেও বেড়িয়ে এল
একদল ছাত্রছাত্রী। সবাই অবাক হয়ে দেখতে লাগল শুধু, কেউ কিছুই বলল না। জয়জিৎ হাঁ
করে তাকিয়ে আছে। বিশ্বাসই করতে পারছে না, এমনও হয়!
দুচোখে আগুন নিয়ে সুকন্যা
বলল, “তেষ্টা মিটেছে, চাতকদা, এতগুলো মেয়ের হাতের জল খেয়ে? লজ্জা থাকলে আর তেষ্টা
পাবে না তোমার”। পাশ থেকে শ্রীপর্ণা বলে উঠল, “এটার জন্য কলেজে আসতে ইচ্ছা করে না”। সবচেয়ে শান্ত মেয়ে ঊর্মিমালা বলে উঠল, “বেচারী অমৃতার মুখের
হাসি মুছে দিয়েছে এই শয়তানটা”। সুকন্যা এখনও ফুঁসছে রাগে, তার মধ্যেই বলল, “এবার
শান্তি”। চারপাশ থেকে হাততালির শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার উপক্রম। এবার আবার
সুকন্যার খুব লজ্জা করছে কিন্তু।
ভীড় ঠেলে এগিয়ে এলেন
বিশাখা ম্যাডাম। “ঠিক কাজ করেছ তোমরা। অন্যায়ের, অসভ্যতার প্রতিবাদ সবসময়ই করা
উচিত। সুকন্যা, আজ তোমার গানও অপূর্ব হয়েছে আর এই সম্মিলিত প্রতিবাদের শুরুও তুমিই
করেছ। চল আজ আমার গাড়ি করে তোমাকে পৌঁছে দিই। একদম না বলবে না। ইউ ডিসার্ভ ইট।
আমরা বড়রা তো কিছুই করতে পারছিলাম না ইউনিয়নের তীব্র অসহযোগিতার আশঙ্কা করে, তুমি
ছোট হয়েও প্রতিবাদ করলে। প্রাউড অফ ইউ”।
ম্যাডামের গাড়িতে করে বাড়ি
ফিরে মাকে সব কথা জানাল সুকন্যা। মা একটুও ভয় পেলেন না বরং খুব খুশী হলেন। কাছে
টেনে নিয়ে অনেক আদর করে বললেন, “কিরে এবার কি ক্যারাটের ক্লাসে ভর্তি হবি? দেখ
ভেবে”।
শ্রাবনী গুপ্ত সরকার